ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী নরুল্লাহ শাওন ছিনতাইকারী কিশোর গ্যাংয়ের কবলে পড়ার পর গতকাল রাতে লাশ উদ্ধার হয়। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে পুলিশ সুপার কার্যালয় ঘেরাও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। শনিবার দুপুরে
ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী নরুল্লাহ শাওন ছিনতাইকারী কিশোর গ্যাংয়ের কবলে পড়ার পর গতকাল রাতে লাশ উদ্ধার হয়। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে পুলিশ সুপার কার্যালয় ঘেরাও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। শনিবার দুপুরে

ময়মনসিংহে কলেজছাত্রের মরদেহ উদ্ধারের পর আলোচনায় ‌‘কিশোর গ্যাং’

ময়মনসিংহ নগরের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ মোহন কলেজের দুই শিক্ষার্থী ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে বেড়াতে গিয়ে ছিনতাইকারী ‘কিশোর গ্যাং’–এর কবলে পড়েছিলেন। ব্রহ্মপুত্র নদ সাঁতরে একজন বেঁচে ফিরলেও গতকাল শুক্রবার রাতে অন্যজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এ ঘটনার পর নতুন করে ময়মনসিংহে ‘কিশোর গ্যাং’–এর অপতৎপরতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অপতৎপরতা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি নাগরিক সমাজের।

মারা যাওয়া শিক্ষার্থীর নাম নুরুল্লাহ শাওন (২৬)। তিনি আনন্দ মোহন কলেজের রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের চর জাকালিয়া গ্রামে।

গত বুধবার বিকেলে জয়নুল আবেদিন উদ্যান এলাকা থেকে নুরুল্লাহ শাওন ও তাঁর বন্ধু মঞ্জুরুল আহসান (রিয়াদ) ব্রহ্মপুত্র নদের বিপরীত পাশে বেড়াতে যান। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তাঁদের দুজনকে ঘিরে ধরে ‘যা আছে বের করতে বলে’ সাতজনের একটি কিশোর দল। নৌকাভাড়া ছাড়া কোনো টাকা নেই জানালে দুজনকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে নুরুল্লাহ প্রতিবাদ করলে বেদম মারতে শুরু করে। তখন দুই বন্ধু দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। চারজন পিছু নেয় শাওনের এবং তিনজন পিছু নেয় মঞ্জুরুলের। মঞ্জুরুল ব্রহ্মপুত্র নদে নেমে সাঁতরে পার হতে পারলেও নুরুল্লাহর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে গতকাল রাতে তাঁর মরদেহ উদ্ধার হয়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নিহত নুরুল্লাহর মা সাহিদা বেগম কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি অভিযোগ করেন। সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় তিন থেকে চারজনকে আসামি করে দেওয়া অভিযোগটি সন্ধ্যায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে পুলিশ। অভিযুক্ত কিশোরদের সবার বয়স ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। তারা নগরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সপ্তম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সবাই নগরের চর জেলখানা বিন পাড়া এলাকার বাসিন্দা। সাত কিশোরই বিন সম্প্রদায়ের। তাদের মধ্যে ১৫ বছর বয়সী একজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।

ছিনতাইকারী কিশোর গ্যাংয়ের ধাওয়ায় নিখোঁজের পর কলেজছাত্রের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গতকাল রাত থেকেই অনেকে ফেসবুকে সমালোচনা শুরু করেন। লাশ উদ্ধারের পর গতকাল রাত ১১টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নগরের টাউন হল এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত অভিযুক্ত কিশোরদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিলে তাঁরা সড়ক ছেড়ে দেন।

আনন্দ মোহন কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক তানজিল আহমেদ বলেন, শহরকে ছিনতাই ও মাদকমুক্ত করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। হত্যায় জড়িত প্রত্যেককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

গত ৩ জানুয়ারি নগরের জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিফতাহুল জান্নাত নিলয় তালুকদারকে (১৫) ছুরিকাঘাত করে তারই সহপাঠীরা। ‘কিশোর গ্যাং’–এ যোগ না দেওয়ায় স্কুল বন্ধের দিন সহপাঠীরা বাসা থেকে স্কুলে ডেকে নিয়ে পিঠে, হাতে, কোমর ও পায়ে অন্তত সাতটি ছুরিকাঘাত করে। এ ঘটনায় ১০ জানুয়ারি কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা করেন মিফতাহুল জান্নাতের বাবা। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়। আসামিরা জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির ডে শিফটের শিক্ষার্থী। আর মিফতাহুল মর্নিং শিফটের শিক্ষার্থী ছিল।

মিফতাহুলের বাবা সাদেকুল ইসলাম তখন বলেছিলেন, ‘ঘটনার দিন বিকেলে আমার ছেলেকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায় তার সহপাঠীরা। স্কুলের ভেতরে কথা–কাটাকাটির এক পর্যায়ে ছুরিকাঘাত করে। যারা ছুরিকাঘাত করে, তারা সবাই মাদকাসক্ত। আমার ছেলেকে তাদের দলে নিতে চেয়েছিল। সে যেতে রাজি না হওয়ায় ছুরিকাঘাত করা হয়। আমি এর বিচার চাই।’

স্থানীয় লোকজন জানান, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উঠতি বয়সী শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকের সঙ্গেও জড়াচ্ছে। এক দল আরেক দলের সঙ্গে মারধর, ছিনতাই—এসব ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। কিন্তু এসব রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কিশোর দলটি নিজেদের এলাকায় সন্ধ্যার দিকে যারা ঘুরতে যায়, তাদের “ঠেক” দিত। তারা সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। ঘটনার পর থেকে দলটিকে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা মুঠোফোনও ব্যবহার করে না। পরিবারগুলোও খুবই দরিদ্র। একজনকে ধরে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। রিমান্ড হলে বিস্তারিত জানতে পারতাম। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় সেই সুযোগ নেই। অন্যদের ধরতে পারলে হয়তো বিস্তারিত জানা যাবে, আসলে কী ঘটেছিল।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সুরতহালে নিহত শিক্ষার্থীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাইনি। পানিতে পড়ে গেলে যেসব চিহ্ন থাকে, সেগুলো ছিল। আমাদের ধারণা, পানিতে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে। কিশোর দলটির প্ররোচনা রয়েছে। ছিনতাইয়ের জন্য তারা ধাওয়া না করলে এমন হতো না।’ কিশোর গ্যাং নিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা একজনের কমান্ডে চলে। যখনই এক দিকে যায়, দল বেঁধে যায়। কেউ কেউ মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত। সবাই কারও শেল্টারে চলে, এমন নয়। বেশির ভাগ অপ্রাপ্তবয়স্ক। এদের খুব সফটলি হ্যান্ডল করতে হয়। আমরা এসব নিয়ে কাজ করছি।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগরের সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারী দলের দৌরাত্ম্য ও মাদক নিয়ে নগরবাসী দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবজ্ঞা দায়ী। কঠোরভাবে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। জনপ্রতিনিধিদেরও এ বিষয়ে কাজ করতে হবে।