স্থানীয় প্রযুক্তির ‘হেডবক্স’ দিয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে শিশুদের অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে। গত সোমবার দুপুরে
স্থানীয় প্রযুক্তির ‘হেডবক্স’ দিয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে শিশুদের অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে। গত সোমবার দুপুরে

বরিশালে হামের প্রাদুর্ভাব

স্থানীয় প্রযুক্তির ‘হেডবক্স’ দিয়ে শিশুদের অক্সিজেন সরবরাহ

বরিশালে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শ্বাসকষ্টে ভোগা শিশুদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরঞ্জামের ঘাটতি মোকাবিলায় চিকিৎসকেরা স্থানীয়ভাবে তৈরি ‘হেডবক্স’ দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করছেন। এটি জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সমাধান দিলেও চিকিৎসা-নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মশিউল মুনীর বলছেন, এতে কোনো নিরাপত্তার সমস্যা নেই। এভাবে অক্সিজেন দেওয়ার বিষয়টি মূলত তাৎক্ষণিকভাবে সীমিত উপকরণ দিয়ে বিকল্প উপায় বের করা। অক্সিজেন যাতে নির্দিষ্টভাবে শিশুর শরীরে পৌঁছায়, সে জন্য স্থানীয়ভাবে এই পদ্ধতির উদ্ভাবন করা হয়েছে।

মশিউল মুনীর আরও বলেন, ‘শিশুদের হাই-ফ্লো নেজাল অক্সিজেন দেওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া আইসিইউ না থাকার বিষয়টি যেভাবে আলোচনা বা প্রকাশ হচ্ছে, সেটা ঠিক নয়। সারা দেশে আইসিইউ বিশেষজ্ঞ আছেন মাত্র ৮ থেকে ১০ জন। আমরা ঢাকায়ও এটি করতে পারিনি। শিশুদের জন্য আইসিইউর বিষয়টি এত সহজ নয়।’

‘হেডবক্স’ কী

১ এপ্রিল থেকে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার কৃষক হাফিজুল ইসলামের পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে তাবাসসুম। জ্বর ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুটি চিকিৎসা নিচ্ছে। শিশুটির অবস্থার অবনতি হলে দুই দিন ধরে তাকে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। চিকিৎসকেরা জানান, প্রচলিত অক্সিজেন মাস্কের অভাবে তাঁরা শিশুটির প্রয়োজনীয় কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করতে পারছিলেন না। পরে একটি প্লাস্টিকের বক্স ছিদ্র করে তাতে অক্সিজেন সরবরাহের নল যুক্ত করে হেডবক্স তৈরি করেন। বক্সের মুখ কাপড় বা গামছা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, যাতে ভেতরের অক্সিজেন বাইরে বেরিয়ে না যায়। ওই বক্সের ভেতরে শিশুর মাথা রেখে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে।

শিশুটির বাবা হাফিজুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শে নার্স ও স্টাফরা এই ব্যবস্থা করেছেন। এতে বাচ্চাটির কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নবজাতক বা শিশুদের জন্য ‘অক্সিজেন হুড’ বা ‘হেডবক্স’ নতুন ধারণা নয়। সাধারণত এটি স্বচ্ছ, সুরক্ষিত ও নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে তৈরি করা যন্ত্র, যেখানে নির্দিষ্ট মাত্রার অক্সিজেন, আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু এখানে ব্যবহৃত পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে অক্সিজেনের সুনির্দিষ্ট ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। এতে কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে থাকার ঝুঁকি থাকে। আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণও নিশ্চিত করা কঠিন।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আবদুল মুনায়েম প্রথম আলোকে বলেন, শিশুদের পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে রোগীরা প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পাচ্ছে।

রোগীর চাপ বাড়ছে

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরেই শয্যাসংকট চলছে। অনেক ক্ষেত্রে এক শয্যায় দুই থেকে তিনজনকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হামের বাড়তি চাপ। হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হামের প্রাদুর্ভাবে প্রতিদিন শিশুদের ভিড় বাড়ছে। গত ১৩ মার্চ থেকে হাসপাতালের প্রথম তলার আইসোলেশন ওয়ার্ডে পৃথক দুটি কক্ষ এবং দ্বিতীয় তলার শিশু ইউনিট-১-এর একটি কক্ষে হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে শয্যাসংকটে একই শয্যায় দুই থেকে তিনজন শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, আজ বুধবার দুপুর পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২৬ জন। বর্তমানে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে রোগী আছে ৯০ জন—যা নির্ধারিত সক্ষমতার তিন গুণের বেশি। এখানে শিশুদের শয্যা আছে মাত্র ২৯টি। তবে ঘণ্টায় ঘণ্টায় রোগীর সংখ্যাগত অবস্থা বদলাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭২ জন রোগী হাসপাতালে এসেছে। এ নিয়ে জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত ৯৮০ জন বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৫৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ১০ জন শিশু। বিভাগের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি বরগুনায়। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে এ জেলায় ভর্তি হয়েছে ১৮ জন। এ ছাড়া বিভাগে মারা যাওয়া ১০ জনের তিনজনই বরগুনার।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা যদি স্থানীয়ভাবে তৈরি অক্সিজেনের হেডবক্স ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই তাঁরা বুঝেশুনেই করেছেন। বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তিনি বলেন, হাসপাতালে হাম উপসর্গের রোগীর চাপ প্রতিদিনই বাড়ছে। তাঁরা বিভাগের বেশি আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছেন। আশা করছেন, দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।