
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের হরিনগর বাজার; বুধবার, বেলা ১১টা। ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল প্রায় নেই বললেই চলে। কোনো মতে একটি পাওয়া গেল, ভাড়া ৩০০ টাকা। গন্তব্য বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসের কাছে, সুন্দরবনের মধু আহরণ মৌসুমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।
গন্তব্য জানাতেই মোটরসাইকেলচালক আজিজুল আলম এক নাগাড়ে বলে গেলেন, ‘এসব অনুষ্ঠান করে কোনো লাভ হবেনানি। যে পরিমাণ ডাকাইত সারেন্ডার কোরিছিল, পাঁচ আগস্টের (২০২৪ সালে) পর এর দ্বিগুণ ডাকাইত এখন সুন্দরবনে। এই ডাকাইতই এখন সুন্দরবনের বাঘ হয়িছে। এহন ডাকাইতের লগে চুক্তি না করে কোনো মৌয়ালের বনে যাওয়ার উপায় নেই। এখন সরকার চাইলে তাগের বন থেকে তুলে নিতে পারে। সারেন্ডারের তালিকা তো বন বিভাগের হাতে আছেই।’
অনুষ্ঠানে সাতক্ষীরা-৪ আসনের (শ্যামনগর-আশাশুনি) সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ডাকাত দমনে মাসে অন্তত দুটি যৌথ অভিযানের কথা বলেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামও একই সুরে বলেন, ‘সুন্দরবনের দস্যুরা আমাদের আশপাশেই রয়েছে। সবাই সচেতন হয়ে সাহসের সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। সঠিক তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করলে দস্যুতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।’
তবে মন্ত্রীর আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারেননি মৌয়ালরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক মৌয়াল, যিনি ডাকাতের হাতে টানা ৯ দিন আটক ছিলেন, হতাশ গলায় বললেন, ‘এরম ঘোষণায় কোনো কাজ না হবি না। ওগের ধরতে হবে, আর ছাড়া যাবি না। আগে ডাকাত ছিল, আর ছাড়লিই বেরিয়ে এসে বাঘ হয়ি যাবে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সুন্দরবনে একসময় প্রধান ভয় ছিল বাঘ। এখন সেই জায়গা দখল করেছে মানুষরূপী ডাকাত।
বন বিভাগের সূত্র জানায়, সাতক্ষীরা রেঞ্জে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর বন রয়েছে। ১–৬ এপ্রিল পর্যন্ত মধু আহরণের জন্য ৯০টি পাস দেওয়া হয়, এতে ৫৭২ জন মৌয়াল বনে প্রবেশের অনুমতি পান।
কিন্তু বনবিভাগের অনুমতি ছাড়াই অনেকে মধু আহরণ করেন। হরিনগর ও আশপাশের মৌয়ালদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বনে ঢোকার আগে বিভিন্ন ডাকাত বাহিনীর প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা করে ‘চুক্তি’ করতে হয়। টাকা দিতে হয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। না দিলে ধরা পড়লে নির্যাতন, এমনকি দ্বিগুণ মুক্তিপণের ঝুঁকি থাকে।
প্রতি বছর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে মৌয়ালেরা অনেকগুলো নৌকা নিয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বনে চাক কাটার উদ্বোধন করতে যান। কিন্তু এবার তা আর হয়নি।
একাধিক মৌয়ালের ভাষ্য, জনাব, দাদা/নানাভাই/ডন ও আলিফ ওরফে আলিম—এই তিন বাহিনীর সঙ্গে আলাদা সমঝোতা করতে হয়। পরে জানা গেল, কোস্টগার্ডের অভিযানের কারণে একটি বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ায় বাকি দুই বাহিনীর সঙ্গে চুক্তি করেই কেউ কেউ বনে ঢুকেছেন।
জনপ্রতি মৌয়ালদের কাছ থেকে যে টাকা আদায় করে ডাকাতদের ভাষায় এই চাঁদার নাম ‘ডিউটি খরচ’। এক মৌয়াল দলের তথ্য অনুযায়ী, ৭৩ জন মৌয়ালকে তিন বাহিনীকে মিলিয়ে জনপ্রতি ১৩ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে। এ জন্য তাঁদের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৪৯ হাজার টাকা।
চুক্তির প্রমাণ হিসেবে দেওয়া হয় একটি টোকেন—কখনো ১০ টাকার, কখনো ৫ টাকার নোট। তাতে বিশেষ চিহ্ন বা নাম লেখা থাকে। ডাকাতের হাতে পড়লে এই টোকেন দেখাতে পারলেই মুক্তি, না হলে নির্যাতন।
এবার একটি বাহিনী টোকেন হিসেবে ১০ টাকার ‘জ স’ সিরিজের নোট, আরেকটি বাহিনী ‘গ ট’ সিরিজের ৫ টাকার নোট ব্যবহার করেছে। টোকেনের টাকার ওপরে বিশেষ রঙের কালি দিয়ে নৌকার দলনেতার নাম লিখে দেওয়া হয়েছে। কোনো বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেই এই টাকার টোকেন দেখালেই তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
গত শুক্রবার সকালে আরেক মৌয়ালের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, তাদের তিন বাহিনীকে টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোস্টগার্ডের ধাওয়া খেয়ে ‘জনাব বাহিনী’ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। এখন ডন আর আলিম বাহিনীর সঙ্গে তাদের চুক্তি করতে হয়েছে। তাদের এক নৌকার আটজন মৌয়ালের জন্য দুই বাহিনীকে ৯০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
চুনকুড়ি নদীর তীরে মনোয়ারা বেগমের উঠান। সেখান থেকে দেখা যায় সুন্দরবনের গাঢ় সবুজ। সেই উঠানেই রাতভর অপেক্ষায় ছিল চারটি পরিবার। মনোয়ারাসহ তাঁদের স্বজনেরা মাছ ধরতে গিয়ে ডাকাতের হাতে ধরা পড়েছেন।
রাত বাড়ে, জোয়ার এসে ঠেকে মনোয়ারা বেগমের উঠানের প্রান্তে। আর আকাশে চলে মেঘ-চাঁদের খেলা। এমন পরিস্থিতি প্রতিটি শব্দে চমকে ওঠেন তাঁরা—এই বুঝি ফিরে এল নৌকা, অথবা এল কোনো খবর।
ডাকাতদের হাতে আটক জেলের দুজন সাইফুল ও মনির। তাঁরা পরস্পর দুই ভাই। মনোয়ারা বেগমের উঠানে বসে তাঁদের মা বলেন, ‘ছেলেদের ভয়ে ভাত মুখে যায় না।’ পাশে বসে থাকা পুত্রবধূও নির্বাক।
এই ফাঁকে মনোয়ারা বেগম নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন—তাঁর স্বামীকে চারবার ধরে নিয়ে গিয়েছিল ডাকাতেরা, একবার দুই পা ভেঙে মাটিচাপা দিয়েছিল। তবে উদ্ধার হওয়ার পরও আবার বনে যেতে হয়েছে জীবিকার তাগিদে।
সকালে জানা গেল, রাত আড়াইটার দিকে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে চারজনই ছাড়া পেয়েছেন। সঙ্গে থাকা ১০ হাজার নগদ, বাকিটা বিকাশে পাঠানোর পর আবার তাঁরা বনে গেছেন।
চুনকুড়ি গ্রামের এক দম্পতি কাঁকড়া ধরতে গিয়ে সম্প্রতি ডাকাতের হাতে পড়েছিলেন। এক নারী সঙ্গে থাকায় ডাকাতেরা তাঁদের অসম্মান করেনি। সারা রাত আটকে রেখে সকালে আবার ছেড়ে দিয়েছে। ওই দম্পতির সামনে হরিনগর গ্রামের তিন জেলেকে গরান কাঠের লাঠি দিয়ে পেটানো হয়েছে। ঘটনাটি জানিয়ে ওই নারী বলেন, ‘তারপরও আমাগের আবার সুন্দরবনে যাতি হবি। আমাগের জীবনের কোনো দাম নেই।’
এলাকার মানুষজনের কথায় বারবার ফিরে আসে একই চিত্র—ডাকাত, চাঁদা, সুদের টাকা। কেউ এক দিনে তিনবার অপহৃত হয়েছেন, কেউ সুদের টাকা নিয়ে মুক্তিপণ দিয়েছেন, আবার সেই ঋণ শোধের আগেই নতুন করে বিপদে পড়েছেন।
চুনকুড়ি নদীর বাঁধের ওপর দিয়ে কাঁধে বাচ্চাকে নিয়ে একজন লোক খেতে যাচ্ছিলেন। তাঁর পাশাপাশি হাঁটছিলে এক নারী। ওই নারী বলছিলেন, সংসদে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম এই ডাকাতদের নিয়ে কথা বলেছে। পেছন থেকে আরেক ব্যক্তি জবাবে বলে উঠেন, ‘ওখানে বলি কোনো কাম নেই। ডাকাতদের ধরতে হবে। আর ছাড়তে হবে না।’
এই আলোচনায় অংশ নিয়ে আকলিমা বেগম নামের এক নারী বললেন, তাঁর স্বামীকে এক দিনে তিনবার ডাকাতে ধরিলে তিনি সুদের ওপর টাকা নিয়ে ছিলেন। সেই টাকা শোধ না হতেই আবার ডাকাতে ধরে। সিংহড়তলী গ্রামের এক জেলে বলেন, চুক্তি না করে একবার ধরা পড়েছিলেন। তাঁর ছোট ছেলে সঙ্গে থাকায় সেবার রক্ষা পেয়েছেন। পরের বার ১০ হাজার দিয়ে বেঁচেছেন। ১ হাজার টাকায় ১০০ টাকা সুদ দিয়ে ঋণ নিতে হয়। এই ব্যবসা এখন এলাকায় জমজমাট।
এলাকার মানুষজনের কথায় বারবার ফিরে আসে একই চিত্র—ডাকাত, চাঁদা, সুদের টাকা। কেউ এক দিনে তিনবার অপহৃত হয়েছেন, কেউ সুদের টাকা নিয়ে মুক্তিপণ দিয়েছেন, আবার সেই ঋণ শোধের আগেই নতুন করে বিপদে পড়েছেন।
২০১৮ সালের আত্মসমর্পণের সময় নজরদারির যে ব্যবস্থা ছিল, এখন তা নেই। সঠিক তথ্য পেলে অভিযান চালিয়ে দ্রুত দমন সম্ভব, কিন্তু সুন্দরবনের ভৌগোলিক জটিলতায় তা কঠিন।ফজলুল হক, বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের রেঞ্জার
মৌয়ালদের এই চুক্তির কথা শোনা গেলেও প্রমাণ পাওয়া কঠিন বলে মন্তব্য করেন বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের রেঞ্জার ফজলুল হক। তিনি বলেন, স্থানীয়দের ভয়ের কারণে তথ্য মেলে না। ডাকাতদের ইনফরমার লোকালয়েই আছে, তাঁদের মাধ্যমেই চুক্তি হয়। কিন্তু তাঁরা জীবনের ভয়ে তথ্য দিতে পারেন না।
ফজলুল হক বলেন, ২০১৮ সালের আত্মসমর্পণের সময় নজরদারির যে ব্যবস্থা ছিল, এখন তা নেই। সঠিক তথ্য পেলে অভিযান চালিয়ে দ্রুত দমন সম্ভব, কিন্তু সুন্দরবনের ভৌগোলিক জটিলতায় তা কঠিন।
ডাকাত নিয়ন্ত্রণে জনবল সংকট বড় সমস্যা উল্লেখ করে বন বিভাগের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আট কিলোমিটার বনের জন্য একজন লোক। এটা অন্তত পাঁচ গুণ বাড়ানো দরকার।’ পাশাপাশি অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও ঝুঁকি ভাতা বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।