ভেজা ধানে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। এক কৃষক এমন ধান দেখিয়ে আক্ষেপ করছিলেন। রোববার দুপুরে মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারের বিরইমাবাদে
ভেজা ধানে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। এক কৃষক এমন ধান দেখিয়ে আক্ষেপ করছিলেন। রোববার দুপুরে মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারের বিরইমাবাদে

মৌলভীবাজার

অপূরণীয় ক্ষতির মুখে প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা, পাননি খোরাকের ধান

চোখের সামনে তলিয়ে আছে পাকা ধানের খেত। পানির তলা থেকে যেটুকু ধান কেটে উদ্ধার করা হচ্ছে, তা–ও রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বৃষ্টির কারণে ধান পচে যাচ্ছে, অনেক আঁটিতে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। পচা ধানের গন্ধ আর ফসল হারানো কৃষকদের আহাজারিতে হাওরপারের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারের একাধিক প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষি ও জমি বন্ধক নিয়ে চাষ করা কৃষকেরা।

একাধিক কৃষকের অভিযোগ, শ্রমিক ও নৌকার সংকটের পাশাপাশি মজুরি ও ভাড়া বেশি হওয়ায় পানি থেকে কুড়িয়ে আনা ধানের মূল্যের সঙ্গে খরচের সামঞ্জস্য থাকছে না। পচন ও জালা ধরার অজুহাতে ক্রেতারা ধান কিনতে চাইছেন না; কিনলেও দিচ্ছেন না ন্যায্যমূল্য। তাঁরা এ অবস্থায় ফসল নিয়ে টানাপোড়েনে আছেন—না পারছেন খেত ফেলে আসতে, না পারছেন তুলতে।

গতকাল রোববার দুপুরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের বিরইমাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কিছুটা রোদ উঠতেই কৃষকেরা ধান বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কেউ আধপাকা ধান কেটে তুলনামূলক উঁচু জায়গায় রাখছেন, কেউ নৌকায় করে কাটা ধান সরাচ্ছেন, কেউ ভেজা ধান মাড়াই করছেন। কোথাও স্তূপ করা ধানে পচন ধরেছে, কোথাও আবার পানি উঠে সেই স্তূপ ডুবছে। নৌকার অভাবে অনেকের কাটা ধান পানিতেই পড়ে আছে।

কৃষকেরা বলছেন, ৪০-৫০ আঁটি ধান আনতে নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আর শ্রমিকের মজুরি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। ফলে ধান বিক্রি করে খরচই উঠছে না। দুই দিন আগেও যেখানে পানি ছিল না, সেখানে এখন পানি উঠে গেছে।

শুকনা জায়গায় ধানের আঁটি স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। সেখানেও উঠে যায় পানি

জেলার রাজনগরের মাথিউরা চা-বাগানের গোপাল নুনিয়া পাঁচ কিয়ার (১ কিয়ার = ৩০ শতক) জমি ইজারা নিয়ে চাষ করেছিলেন। পানির নিচ থেকে মাত্র চার শতক জমির ধান তুলতে পেরেছেন। ঝাড়াই-বাছাই করে পেয়েছেন দুই থেকে তিন মণ ধান। ছয়জন শ্রমিক দিয়ে ধান তুলতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় আট হাজার টাকা। এর আগে এক কিয়ার জমিতে চাষাবাদেই খরচ হয়েছিল ১০ হাজার টাকার বেশি।

হাতের ইশারায় দেখিয়ে গোপাল নুনিয়া নামের এক চাষি বলেন, ‘পানির নিচের এই জায়গাটুকু আমার খেত। এই খেত থুইয়া যাইতে ইচ্ছা করে না। এক ফুট ধানের ছড়া অইছিল। এক হাত পানি নামলে এখনো ধান কাটতে পারতাম। হাউস (শখ) করি খেত করছিলাম। এত কষ্ট করছি। এখন কুনতা করার নাই।’

পানিতে ভিজে অনেক ধান পচে গেছে। তবু রোদ পেয়ে সেগুলো শুকানোর চেষ্টা করছেন এক কৃষক

রাজনগরের জলিল মিয়া বলেন, ‘ভুক্তি (বন্ধক) নিয়া পাঁচ কিয়ার খেত করছিলাম। মাত্র আধ কিয়ার তুলছি। কিছু ধান কাটিয়া থইছলাম। ডুবিয়া আঁটি তুলছি। নৌকা নাই। এখন সব পানির মোড়। কিতা যে করি।’

বিরইমাবাদ গ্রামের আবদুল কাদির ১০ কিয়ার জমি বর্গা চাষ করেছিলেন, এর মধ্যে ৬ কিয়ার এখন পানির নিচে। ৪ কিয়ার জমির ধান কাটতে তাঁর খরচ হয়েছে ২৪ হাজার টাকা, কিন্তু বিক্রি করেছেন ২৩ হাজার টাকায়। তিনি বলেন, ‘ধানে খ্যাং (চারা) অই গেছে, পচে গেছে। কেউ নিত চায় না। কাইলকুর মেঘে অটাল পানি বাড়ছে। আজকে তিন-চাইর আঙুল পানি বাড়ছে।’ নিজের ধান তুলতে না পেরে এখন তিনি দেড় হাজার টাকায় নৌকা ভাড়া নিয়ে অন্যের ধান পরিবহনের কাজ করছেন।

পানির নিচ থেকে কেটে আনা ভেজা ধান নেওয়া হচ্ছে পাড়ে

বুড়িকোনা গ্রামের আলাল মিয়া বলেন, ‘২০ কিয়ার জমি পানির তলে। চাইর কিয়ারর ধান তুলছি। যেগুইন তুলছি, অগুইনতরও অবস্থা খারাপ।’

শফিক মিয়া বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ধানগুলা সব নষ্ট অইয়া গেছে। গেরা দিছে। আমরার অখন খোরাকি নাই। সব খেত পানির তলে।’ একই ধরনের হাহাকার এখন অঞ্চলটির প্রায় সব কৃষকের কণ্ঠে।

কাদা ঠেলে ঠেলাগাড়িতে ধান নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন

এদিকে কাউয়াদীঘি হাওরের কৃষকের ফসল রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে মৌলভীবাজারের হাওর রক্ষা আন্দোলন। গতকাল দুপুরে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এ স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে জরিপের মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান মৌলভীবাজারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত জেলায় ২ হাজার ৩৪৯ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে। কাউয়াদীঘি হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সেচ চললেও ভারী বর্ষণের কারণে দ্রুত পানি নামানো যাচ্ছে না।