শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত অক্সিজেন হাসপাতালে পাঠানোর দায়ে চট্টগ্রামে একটি প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ১৮ মে নগরের আকবর শাহ এলাকায়
শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত অক্সিজেন হাসপাতালে পাঠানোর দায়ে চট্টগ্রামে একটি প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ১৮ মে   নগরের আকবর শাহ এলাকায়

শিল্পকারখানার অক্সিজেন যাচ্ছে হাসপাতালে, স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটুকু

চট্টগ্রাম নগরের আকবর শাহ থানার লেকসিটি এলাকার এসবি এন্টারপ্রাইজ নামের একটি মেডিক্যাল অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছিল ছোট-বড় নানা আকৃতির অক্সিজেন সিলিন্ডার। ১৮ মে ওই দোকানে অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। অভিযানে সিলিন্ডারে সংরক্ষিত অক্সিজেন শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত অক্সিজেন (ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন) বলে প্রমাণ মেলে। কম দামে এসব অক্সিজেন পুরোনো সিলিন্ডারে ভর্তি করার পর রং করে পাঠানো হচ্ছিল নগরের দুটি বেসরকারি হাসপাতালে।

কেবল আকবর শাহ থানা এলাকার ওই প্রতিষ্ঠান নয়, বিভিন্ন হাসপাতালের আশপাশের মেডিক্যাল সামগ্রীর দোকানেও এমন শিল্পকারখানার অক্সিজেন বিক্রি হচ্ছে বলে ভোক্তা অধিকারসহ সরকারি দুটি সংস্থার কর্মকর্তাদের ধারণা।

শিল্পকারখানার অক্সিজেনে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের মতো গ্যাস মিশ্রিত থাকতে পারে। পুরোপুরি বিশুদ্ধ না হওয়ায় এতে রোগীর স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে। বাড়ে শারীরিক নানা জটিলতা।

১৮ মে আকবর শাহ থানার লেকসিটি এলাকায় এসবি এন্টারপ্রাইজে অভিযানের সময় ওই প্রতিষ্ঠানের অক্সিজেন সরবরাহের কোনো সনদ পাননি ভোক্তা অধিকার ও ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। দোকানে উদ্ধার করা নথিপত্রেই সেগুলোকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বা শিল্পকারখানার অক্সিজেন সিলিন্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ‘ওই প্রতিষ্ঠানটি মেডিক্যাল অক্সিজেন বলে শিল্পকারখানার অক্সিজেন দুটি হাসপাতালে সরবরাহ করছিল। অভিযানে আমরা এর সত্যতা পেয়েছি। প্রতিষ্ঠানকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। চট্টগ্রামে আর কোনো দোকানে এমন ভেজাল অক্সিজেন বিক্রি হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে আমরা খোঁজ নিচ্ছি।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিল্পকারখানার অক্সিজেনে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের মতো গ্যাস মিশ্রিত থাকতে পারে। পুরোপুরি বিশুদ্ধ না হওয়ায় এতে রোগীর স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে। বাড়ে শারীরিক নানা জটিলতা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, বর্তমানে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। হামে আক্রান্ত রোগীদের একটি অংশে নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে, যার কারণে অক্সিজেন-সহায়তা প্রয়োজন হয়। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন সরাসরি রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যবহার করা হলে সংক্রমণ, ফুসফুসের ক্ষতি কিংবা অন্যান্য জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

শিল্পের অক্সিজেন মানব শরীরে

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর জানিয়েছে, চট্টগ্রামে মেডিক্যাল অক্সিজেন সরবরাহ করার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান লিনডে বাংলাদেশ লিমিটেড ও স্পেক্ট্রা অক্সিজেন লিমিটেড। আরেকটি প্রতিষ্ঠান এখনো অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন।

দুটি শিল্পগ্রুপ শিল্প অক্সিজেনের পাশাপাশি মেডিক্যাল অক্সিজেন সরবরাহের অনুমোদন পেয়েছে। তবে অনুমোদন ছাড়াও অনেকে শিল্প অক্সিজেন বাজারে বিক্রি করছে মেডিক্যাল অক্সিজেন নামে।

শিল্পের অক্সিজেন মেডিক্যালে দেওয়ায় বড় রকমের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে। ঈদের বন্ধের পর আমরা অভিযানে নামব।
মোহাম্মদ বাদল শিকদার, সহকারী পরিচালক, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসবি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. বিল্লাল হোসেন সীতাকুণ্ডের একটি কারখানা থেকে শিল্পকারখানার অক্সিজেন সংগ্রহ করে দুটি হাসপাতালে সরবরাহ করতেন। এর মধ্যে একটি হাসপাতালে তিনি নিজেই অংশীদার। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিল্লাল হোসেনের মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি কল ধরেননি, ফলে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।

চট্টগ্রাম নগরে সবচেয়ে বেশি অক্সিজেন সিলিন্ডারের দোকান রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশে। গত রোববার সেখানে কয়েকটি দোকান ঘুরে সাদা-কালো রঙের অক্সিজেন সিলিন্ডার দেখা গেছে। তবে এর মধ্যে কোনটি হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য এবং কোনটি শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য, সেটি দেখে বোঝার উপায় নেই। অধিকাংশ বোতলের গায়ে জং ধরা ও রং উঠে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দোকানি প্রথম আলোকে বলেন, বিওসি (লিনডে) ও স্পেক্ট্রার অক্সিজেনের বিশুদ্ধতা ৯২ থেকে ৯৯ শতাংশ। তবে ভিন্ন নামে এখানে অনেক অক্সিজেন বিক্রি হয়, যেগুলোর বিশুদ্ধতা ৮০ শতাংশও নয়। বিশুদ্ধ অক্সিজেনের ১০ লিটার বোতল মেশিনসহ ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অনেকে কম দামে অবিশুদ্ধ অক্সিজেন বিক্রি করে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ বাদল শিকদার বলেন, ‘চট্টগ্রামে এখন দুটি প্রতিষ্ঠান মেডিক্যাল অক্সিজেন সরবরাহ করে। আরও একটি কারখানা প্রক্রিয়াধীন, তবে শিল্পের অক্সিজেন মেডিক্যালে দেওয়ায় বড় রকমের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে। ঈদের বন্ধের পর আমরা অভিযানে নামব।’

পার্থক্য ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কোথায়

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে ব্যবহৃত মেডিক্যাল অক্সিজেন ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত অক্সিজেনের মৌলিক উপাদান একই হলেও বিশুদ্ধতা, মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। চিকিৎসা খাতে ব্যবহৃত মেডিক্যাল অক্সিজেনের বিশুদ্ধতার মাত্রা সাধারণত ৯৯ শতাংশের বেশি থাকে এবং এটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যমান অনুসরণ করে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মেডিক্যাল অক্সিজেনে নাইট্রোজেন, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, আর্দ্রতা ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রোগীদের শ্বাস-প্রশ্বাসে সরাসরি প্রয়োগ করা হয় বলে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে মান পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকে। পাশাপাশি সিলিন্ডার সংরক্ষণ ও পরিবহনেও অনুসরণ করতে হয় নির্দিষ্ট নিরাপত্তা প্রটোকল।

অন্যদিকে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত অক্সিজেনে প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত অক্সিজেন থাকলেও এতে কার্বন মনোক্সাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর গ্যাসের উপস্থিতি থাকতে পারে। এই অক্সিজেন মূলত ওয়েল্ডিং, ধাতু কাটা ও শিল্প উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এ ধরনের অক্সিজেন মানবদেহে ব্যবহার করলে নানা ধরনের রোগ সংক্রমণ হতে পারে।

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব সুশান্ত বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন ব্যবহারে ফুসফুস, মস্তিষ্ক ও রক্তে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে মৃত্যুও হতে পারে। হাসপাতালের আশপাশে এ ধরনের অক্সিজেন কীভাবে বিক্রি হচ্ছে, সেটি সরকারি সংস্থাগুলোকে তদারকি করতে হবে।