কোরবানির ঈদে সবশেষ বাড়িতে এসেছিলেন সেনাসদস্য মো. তাসনিম রিফায়াত। শিগগিরই আবার বাড়িতে আসবেন, এমন অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। সেই অপেক্ষার আজ অবসান হয়েছে। তবে রিফায়াত যখন বাড়িতে এসে পৌঁছান, তখন তাঁর দেহে প্রাণ ছিল না।
রিফায়াতের বাড়ি রাজশাহীর পবার বিন্দারামপুর গ্রামে। তাঁর অপেক্ষায় আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বাড়ির সামনে মানুষের ভিড় জমেছিল। বেলা একটার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাসনিম রিফায়াতের মরদেহ যখন বাড়িতে পৌঁছায়, তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। প্রতিবেশীরাও ছুটে আসেন।
বাড়ির পাশেই বেলা দুইটার দিকে রিফায়াতের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চান বাবা মো. আসাদুল হক। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও রিফায়াতের দায়িত্ব ও দেশের প্রতি তাঁর ত্যাগের কথা স্মরণ করে দোয়া চাওয়া হয়। জানাজা শেষে সেনাবাহিনীর সদস্যরা মরদেহের প্রতি সম্মান জানান। পরে মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয় রিফায়াতকে।
গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ফায়ারিং অনুশীলনের সময় একটি ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় আকস্মিক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুজন সৈনিক নিহত এবং একজন কর্মকর্তা গুরুতরভাবে আহত হন। চট্টগ্রামে সকালে জানাজা শেষে আজ দুপুরের দিকে হেলিকপ্টারে করে রিফায়াতের মরদেহ রাজশাহী সেনানিবাসে আনা হয়। সেখান থেকে নেওয়া হয় তাঁর গ্রামের বাড়িতে। যে বাড়িতে অপেক্ষা ছিল ছেলের ফিরে আসার, সেই বাড়িতেই শেষবারের মতো ফিরলেন রিফায়াত কফিনবন্দী হয়ে।
তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে রিফায়াত ছিলেন দ্বিতীয়। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া কোরে সৈনিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রায় চার বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়। স্ত্রী ও আড়াই বছরের মেয়ে রাফসা তাসনিম ইকরাকে নিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সরকারি বাসভবনে থাকতেন তিনি।
পাঁচ থেকে সাত দিন আগে বাবার সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন রিফায়াত বাবাকে জানিয়েছিলেন, বদলি হয়ে বগুড়ায় যাওয়ার কথা। সেখানে যোগ দেওয়ার পর বর্তমান কর্মস্থল থেকে চলে যেতে হবে। তাই বাড়িতে ফিরতে আরও দু-চার দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছিলেন বাবাকে।
সেটিই যে রিফায়াতের সঙ্গে শেষ কথা হবে, তা ভাবেননি বাবা আসাদুল হক। ছেলের মৃত্যুর কথা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় বাড়িতে বসে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ আমার ছেলেটা গেছে। যাঁদের সন্তান হারান, তাঁদের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত এই দাগ, জ্বালা ও কষ্ট থেকে যায়।’
রিফায়াতের আড়াই বছরের মেয়ে রাফসা এখনো জানে না, তার বাবা আর ফিরবেন না। পরিবারের সদস্যরা জানান, সে মাকে জিজ্ঞাসা করছে, ‘আব্বু কেন আসছে না’।
আজ দুপুরে জানাজার আগে সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, তাসনিম রিফায়াত ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া কোরে যোগ দেন। গতকাল ৯ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা ২৮ মিনিটের দিকে সামরিক মহড়া চলছিল। এ সময় ট্যাংক থেকে গোলা ছোড়ার সময় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। গোলাটি ব্যারেল দিয়ে বের না হয়ে ট্যাংকের ভেতরে বিস্ফোরিত হয়। এতে রিফায়াত নিহত হন।
ওই কর্মকর্তা রিফায়াতের জন্য সবার কাছে দোয়া চান। তাঁর কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ জানান।
রিফায়াত এক বছর আগে তাঁর মাকে হারিয়েছিলেন। প্রায় এক বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর মা। মায়ের শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই এবার ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি আবারও শোকে ডুবে গেল। রিফায়াতের বড় ভাই এ বি মাহমুদ ও ছোট ভাই শামসাদ আহমেদ। স্বজনেরা বলছেন, আকস্মিক এই মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁরা।