মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় প্রথম আলোর ফিচার বিভাগের প্রধান ফটোসাংবাদিক কবির হোসেনকে কুপিয়ে ও তাঁর ছোট ভাইকে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার লতব্দি ইউনিয়নের দোসরপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
লতব্দি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর মাদবরের নেতৃত্বে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে আহত কবির হোসেন জানিয়েছেন। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জাহাঙ্গীর মাদবরকে পুলিশ আটক করেছে।
আহত কবির হোসেন (৪৫) দোসরপাড়া এলাকার প্রয়াত মালেক মাদবরের ছেলে। অন্য আহত ব্যক্তি কবির হোসেনের ছোট ভাই তকবির হোসেন (৪৪)। কবির হোসেনকে উদ্ধার করে প্রথমে সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, দোসরপাড়া এলাকায় কবির হোসেনদের পরিচালিত একটি লালন চর্চাকেন্দ্র আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর মাদবর ও ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আলাউদ্দিন মাদবর ওই চর্চাকেন্দ্র ও এর জমি দখল করে ইটভাটা নির্মাণের চেষ্টা করে আসছিলেন। এ নিয়ে কবির হোসেনকে প্রায়ই হুমকি দিয়ে আসছিলেন তাঁরা। আজ মঙ্গলবার দুপুরে কবির হোসেন লালন চর্চাকেন্দ্রের সীমানা বেড়ার কাজ করছিলেন। এমন সময় জাহাঙ্গীর মাদবর, তাঁর ছেলে তৌহিদ মাদবর, জাহেদ মাদবর, আলাউদ্দিন মাদবর, শাহরিয়ার মাদবর, সংগ্রাম, সাহিল, আহম্মদ মাদবরসহ কয়েকজন হামলা করেন। হামলার সময় কবির হোসেনের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেওয়া হয়। কবিরের ভাই তকবির হোসেন তাঁকে বাঁচাতে এলে তাঁর ওপরও হামলা চালানো হয়। পরে আহতদের উদ্ধার করে সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জাহানারা আক্তার বলেন, বেলা দেড়টার দিকে কবির হোসেনসহ আহত দুজনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে কবির হোসেনের মাথা ও দাঁতে গুরুতর আঘাত আছে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
হাসপাতালের শয্যায় আহত কবির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পর থেকে দোসরপাড়ার লালন চর্চাকেন্দ্র দখলের চেষ্টা করেছে জাহাঙ্গীর ও আলাউদ্দিনরা। আখড়া বাঁচাতে হলে তারা আমার কাছে টাকা চেয়েছিল। আমি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম। এ কারণে কিছুদিন পরপর এখানকার মানুষদের চড়-থাপ্পড় দিত। চর্চাকেন্দ্রে এসে মাদক সেবন ও মাদকের ব্যবসা করত। দর্শনার্থীরা এলে জাহাঙ্গীর ও তাদের লোকজন বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করত। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো এ চর্চাকেন্দ্রও পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছিল। তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে স্থানটিকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। এ জন্য তারা আমার পেছনে লেগেছিল। আমাকে মেরে ফেলার জন্য দলবল নিয়ে হামলা করেছে। আমার ভাই ও স্ত্রীর কারণে কোনোমতে বেঁচে গেছি।’
স্থানীয় বাউলশিল্পী ও কবির হোসেনের ভাই তকবির শাহ অভিযোগ করে বলেন, ‘সময়মতো না গেলে ওরা কবিরকে মেরে ফেলত। আমি নিজেও আহত হয়েছি। লালনের চর্চাকেন্দ্র বাঁচাতে গিয়ে আমার ভাই ও আমাদের পরিবার বিএনপি ও যুবলীগ নেতাদের আক্রোশের শিকার হয়েছে। এখন জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়েছে।’
হামলার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছে বলে জানান সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হান্নান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে মূল অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে অন্য যারা জড়িত, তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম হায়দার আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘অপরাধী কেউ আমাদের দলের নাম ভাঙিয়ে রক্ষা পাবে না। হামলার বিষয়টি আমরা যখন জানতে পারি, তখন আমরা থানায় উপস্থিত ছিলাম। তাৎক্ষণিকভাবে জাহাঙ্গীরসহ যারা অপরাধী, তাদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে অনুরোধ করেছি। অপরাধীকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’