২০২৩ সালে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক এই সাইনবোর্ড বসায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। এটিকে ঘিরে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়ায় কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আকবরনগর ও মিরারচরের গ্রামবাসী। সম্প্রতি তোলা
২০২৩ সালে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক এই সাইনবোর্ড বসায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। এটিকে ঘিরে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়ায় কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আকবরনগর ও মিরারচরের গ্রামবাসী। সম্প্রতি তোলা

ভৈরবে দুই গ্রামের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নেপথ্যে একটি ‘সাইনবোর্ড’

একটি সাইনবোর্ড। সবুজ পটভূমিতে সাদা অক্ষরে লেখা— ‘আকবরনগর বাজার। উল্টো পথে আর নয়, নিয়মনীতির হবে জয়।’ ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় ভৈরব-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের বসানো সচেতনতামূলক সাইনবোর্ডটিই এখন দুই গ্রামের রক্তক্ষয়ী বিরোধের প্রতীক।

সাইনবোর্ডে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধে গত সোমবার আবারও সংঘর্ষ হয়েছে। এতে উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের মিরারচর গ্রামের মাসুদ ও হিরণ নামে দুজন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। সংঘর্ষে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি কয়েক ঘণ্টা বন্ধ ছিল ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল। আতঙ্কে ঘর ছেড়েছেন অনেক মানুষ।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, এটি শুধু একটি নামের বিরোধ নয়। একটি সাইনবোর্ডকে কেন্দ্র করে তিন বছরে ভেঙে গেছে আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের বহু বছরের সামাজিক সম্পর্ক, আত্মীয়তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক বিশ্বাস। দুই গ্রামের মানুষ এখন একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখেন। বাজারের ব্যবসা থেকে সামাজিক অনুষ্ঠান—সবখানেই তৈরি হয়েছে বিভাজন।

ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লিটন মিয়ার অভিযোগ, স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত না নিয়েই সওজ একটি গ্রামের নাম উল্লেখ করে অন্য গ্রামের নাম বাদ দেয়। একটি সাইনবোর্ডের আগুনে আজ দুই গ্রামের মানুষ পুড়ছে।

বাজারসংলগ্ন আকবরনগর বাসস্ট্যান্ডের যাত্রীছাউনি

যৌথ বাজারের ইতিহাস, একক পরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্ব

সোমবার বিকেলে সরেজমিনে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৩ সালে নাম নিয়ে প্রথমবার সংঘর্ষের পর থেকে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ কমে যায়। আগে যে বাজারে সবাই নির্বিঘ্নে কেনাকাটা করতেন, সেখানে এখন অনেকেই আগে খোঁজ নেন দোকানির বাড়ি কোন গ্রামে। অনেক ক্রেতা গ্রাম পরিচয় দেখে দোকান বেছে নেন। ব্যবসার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাজারটিতে চায়ের দোকান আছে জাকির মিয়ার। তিনি ওই দুই গ্রামের কেউ নন, তবে বাসিন্দাদের এমন দ্বন্দ্বের ভুক্তভোগী। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা সাইনবোর্ড এত দিনের সম্পর্ক শেষ কইরা দিছে।’

পাশের গ্রামের কয়েকজন ব্যবসায়ীও বলেন, বিরোধের পর বাজারে আকবরনগর ও মিরারচরের ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কমে গেছে। এখন আশপাশের গ্রামের মানুষ তুলনামূলক বেশি ব্যবসা করছেন।

স্থানীয় প্রবীণদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। পরে ১৯৯১ সালে দুই গ্রামের মানুষের উদ্যোগে বাসস্ট্যান্ডের দুই পাশে বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বাজার প্রতিষ্ঠায় আকবরনগরের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য কাদির মিয়ার পাশাপাশি মিরারচরের করম আলী, মস্তু মিয়া, বরজু মিয়াসহ দুই গ্রামের অনেকেই ভূমিকা রাখেন। সেই থেকে বাজারটি স্থানীয়ভাবে ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিতি পায়।

বর্তমানে বাজারটিতে ২০০টির বেশি দোকান আছে। বাজারের সরকারি কোনো নাম নেই, সরকারি ইজারাও হয় না। সেখানে ২১ শতাংশ জায়গা ব্যক্তিমালিকাধীন এবং এর মালিক মোট ৬৬ জন। ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালিত হয়। বাজার পরিচালনায়ও দুই গ্রামের মধ্যে অলিখিত ভারসাম্য আছে। সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ হন আকবরনগরের প্রতিনিধি আর সাধারণ সম্পাদক হন মিরারচরের প্রতিনিধি। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই সমঝোতায় বাজার পরিচালিত হয়ে আসছিল।

বাজারের নামকরণ নিয়ে সংঘর্ষে কয়েকটি বাড়িঘরও ভাঙচুর করা হয়। সোমবার বিকেলে আকবরনগর গ্রামে

সাইনবোর্ড থেকেই সংঘর্ষের শুরু

২০২৩ সালের জুলাইয়ে সওজ সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক একটি সাইনবোর্ড বসায়। সেখানে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা থাকায় আপত্তি তোলেন মিরারচরের লোকজন।

একই বছরের ৯ জুলাই মিরারচরের বাসিন্দারা একটি সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেন। এরপর কয়েক দিন ধরে দফায় দফায় সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হন। এমনকি পুলিশ সদস্যও আহত হন, ভাঙচুর হয় বহু দোকান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, তখন সংঘর্ষ থেমেছিল; কিন্তু বিরোধ থামেনি। বরং মানুষের মনে স্থায়ী বিভাজন তৈরি হয়।

আবার জেগেছে পুরোনো ক্ষত

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, চলতি বছরের ১৯ জুলাই বাজার এলাকায় রিকশার ধাক্কাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়। মিরারচরের দ্বীন ইসলাম অভিযোগ করেন, আকবরনগরের রিকশাচালক শরিফ মিয়া তাঁকে ধাক্কা দেন। অন্যদিকে শরিফের দাবি, তিনি শুধু রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন; কিন্তু গ্রামের পরিচয়ের কারণেই তাঁকে মারধর করা হয়।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মিরারচরের মানুষ আবার সাইনবোর্ড পরিবর্তনের দাবি তোলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।

আকবরনগরবাসীর যুক্তি, বাজারের তিন দিকই তাঁদের গ্রামের মধ্যে। বাসস্ট্যান্ড সরকারি নথিতে আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড হিসেবে পরিচিত। বাজার আকবরনগর মৌজায় অবস্থিত এবং জমির বড় অংশও তাঁদের। তাই সাইনবোর্ডে অন্য কোনো গ্রামের নাম যুক্ত করার সুযোগ নেই। প্রয়োজনে প্রাণ দেবেন, তবু সাইনবোর্ড সরবে না।

বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে সংঘর্ষের চিহ্ন

আকবরনগরের বাসিন্দা আহসান উল্লাহ বলেন, ‘আমার বাড়ি, আমার ঘর। মিরারচরের মানুষই আমাদের গ্রামের ওপর দিয়া বাজারে আসা–যাওয়া করে। তাহলে আমার নাম–পরিচয়ের ভাগ অন্যরে দিমু কেন?’

অন্যদিকে মিরারচরবাসীর বক্তব্য, বাজারটি দুই গ্রামের যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এবং তিন দশকের বেশি সময় যৌথভাবেই পরিচালিত হয়েছে। তাই হঠাৎ সাইনবোর্ডে তাঁদের গ্রামের নাম বাদ দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। শুধু একটি গ্রামের নামে সরকারি সাইনবোর্ড দেওয়া ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মিরারচরের বাসিন্দা ও বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক বরজু মিয়া বলেন, ‘বাজার প্রতিষ্ঠা করেছি দুই গ্রামের মানুষ মিলে। পরিচালনাও ভাগাভাগি করে করছি। তাহলে সাইনবোর্ডে শুধু এক গ্রামের নাম থাকবে কেন?’

মিরারচরের একাধিক বাসিন্দার দাবি, হয় আগের মতো ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নাম ফিরিয়ে দিতে হবে, নয়তো মিরারচরের নামও সমানভাবে যুক্ত করতে হবে।

উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেন পুলিশ সদস্যরা। সোমবার তোলা

প্রশাসন ও সওজ কী বলছে

ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশিদ বলেন, বিরোধের স্থায়ী সমাধানে উপজেলা প্রশাসন শুরু থেকেই বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সর্বশেষ সংঘর্ষের আগের দিনও দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক হয়। সেখানে সংঘর্ষে না জড়ানোর অঙ্গীকার করা হলেও তা রক্ষা হয়নি। এখন উচ্চপর্যায়েও সমাধানের বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা চলছে।

সওজের কর্মকর্তারা জানান, সাইনবোর্ডটি মূলত সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বার্তা দেওয়ার জন্য বসানো হয়েছিল। যেহেতু স্থানটি আকবরনগর মৌজার মধ্যে এবং বাসস্ট্যান্ডটি আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড নামে পরিচিত, তাই সাইনবোর্ডে ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হয়।

তবে সওজ কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, সরকারি গেজেটে কোনো নাম নির্ধারিত না থাকলে প্রচলিত নাম ব্যবহার করা হয়। তবে একটি সাইনবোর্ড যদি জনশান্তি বিঘ্নিত করে এবং প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে জনস্বার্থে সেটি সংশোধন বা অপসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।