
‘ওরে আপা, আপা রে, চিরকাল সংসারের ঘানিই টাইনা গেলি, নিজের কথা একবারের জন্যও ভাবলি না’—কাঁদতে কাঁদতে একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলেন লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত নারী শ্রমিক দিপালী বেগমের ছোট বোন লাইজু বেগম (২৪)।
ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পূর্ব শালেপুর মুন্সিরচর গ্রামের মেয়ে দিপালী বেগম। বাবা শেখ মোকা দিনমজুর, তাঁর কোনো কৃষিজমি নেই। মা রাজিয়া বেগম মারা গেছেন অন্তত আট বছর আগে। তাঁদের নিজস্ব কোনো জমি নেই। খাসজমিতে কোনোভাবে মাথা গোঁজার জায়গা করে পড়ে রয়েছে পরিবারটি। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় শেফালী, এরপর দিপালী, তারপর দুই ভাই ওবায়দুর ও সিকেন্দার এবং সবার শেষে লাইজু। ২০১১ সালে জীবিকার তাগিদে প্রথম লেবাননে যান দিপালী। তখন তাঁর বয়স ১৯ বছর। দিনের পর দিন টাকা পাঠাতেন দেশে। সেই টাকা দিয়ে দুটি ভাঙা ছাপরা থেকে তোলা হয় দুটি চারচালা টিনের ঘর। তিনি বাদে একে একে সব ভাই–বোনের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়েতে আর্থিকভাবে সাহায্য করেন দিপালী। একে একে সব ভাইবোনের বিয়ে হয়ে গেলেও বিয়ের কথা ভাবেননি দিপালী।
শৈশবে অভাবের কারণে স্কুলের দুয়ারে পা রাখা হয়নি দিপালীর। নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন লেবাননে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগুন কেড়ে নিল সেই স্বপ্নচারী নারীকে। ২০১১ সালে যখন দিপালী প্রথম জীবিকার তাগিদে লেবাননে যান, তখন ছোট বোন লাইজু বেগমের বয়স ছিল ১০–১১ বছর। বড় বোনের সঙ্গে কাটানো সেই শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন লাইজু।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাইজু বলেন, ‘আপার সঙ্গে ছোটবেলার অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে পারেনি আমার আপা। আপা সারা জীবন শুধু আমাদের জন্যই ভেবেছে। বিদেশ থেকে যখন দেশে আসত, নিজের সবটুকু দিয়ে আমাদের জন্য কিছু না কিছু আনার চেষ্টা করত। নিজের জন্য কোনো দিন ভাবেনি, সবটুকুই বিলিয়ে দিতে চেয়েছে সংসারের জন্য।’
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ এবং ২০২৩ সালে দুবার দেশে এলেও শেষবার তাঁর ফিরে যাওয়া ছিল কিছুটা অভিমানের। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যখন তিনি দেশে আসেন, পরিবার তাঁকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্র ঠিক করেছিল। কিন্তু স্বাবলম্বী দিপালী সাফ জানিয়ে দেন, তিনি বিয়ে করবেন না। পরে অনেকটা জোর করে তাঁকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর চেষ্টা করা হলে তিনি একপ্রকার জেদ করেই ২০২৪ সালের এপ্রিলে পাড়ি জমান লেবাননে। কিন্তু অভিমানের সেই যাওয়াই দিপালীর শেষ যাওয়া হবে, তা কি পরিবারের কেউ সেদিন ভেবেছিল? ৮ এপ্রিল বৈরুতের যে ভবনে দিপালী কর্মরত ছিলেন, সেখানেই বোমার আঘাত হানে ইসরায়েল। গুরুতর আহত অবস্থায় বৈরুতের রফিক হারিরি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অথচ ওই দিন সকালেই ছোট বোনের সঙ্গে শেষবারের মতো ইমোতে কথা হয়েছিল দিপালীর।