উঁচু টিলার ওপর চা–পাতা সংগ্রহ করছিলেন শকুন্তলা বাউরি নামের এই নারী শ্রমিক। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চন্ডিছড়া চা–বাগানে
উঁচু টিলার ওপর চা–পাতা সংগ্রহ করছিলেন শকুন্তলা বাউরি নামের এই নারী শ্রমিক। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চন্ডিছড়া চা–বাগানে

চা দিবসে শ্রমিকদের কথা: ‘ভাগ্য বদলাইছে না, অনেক কষ্টের মইধ্যে জীবন কাটাই’


দুপুরের তেঁতে ওঠা সূর্যকে তখন ঢেকে দিয়েছে খণ্ড খণ্ড মেঘ। এর ছায়া এসে পড়েছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চন্ডিছড়া চা–বাগানের ভিন্ন ভিন্ন টিলায়। এর মধ্যে পুরোনো ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসংলগ্ন গাছের ছায়ায় বসে বৃহস্পতিবার দুপুরে খাবার খাচ্ছিলেন আট নারী শ্রমিক। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তাঁদের উদ্দেশ করে জানতে চাইলাম, ‘কেমন আছেন আপনারা?’

তাচ্ছিল্যের সুরে কবিতা গঞ্জু (৩০) নামের এক শ্রমিক পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন, ‘চা–শ্রমিকেরা খারাপ থাকে? কতজন আসছে, দেখে গেছে, আমাদের ভাগ্য বদলাইছে না। অনেক কষ্টের মইধ্যে জীবন কাটাই।’

চা–বাগানে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে কবিতা বলেন, তাঁর দুই ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে তাঁর মেয়ে পড়ছে চুনারুঘাটের অগ্রণী উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখানে যেতে ১০ টাকার ভাড়ার প্রয়োজন হয়। টাকার অভাবে তাকে আজ স্কুলেই পাঠাতে পারেননি।

খাবার খেয়ে আবার বাগানে কাজে ফিরে যাচ্ছেন এসব নারী শ্রমিক। বৃহস্পতিবার দুপুরে চুনারুঘাটের চন্ডিছড়া চা–বাগানে

কথায় কথায় জানা গেল, ওই নারীরা বাগানটিতে ন্যাশনাল টি করপোরেশনের অধীন চা–শ্রমিকের কাজ করছেন। আজ বিশ্ব চা দিবস, এ কথা জানেন কি না—প্রশ্ন ছুড়লে একযোগে প্রায় সবাই বলে ওঠেন, ‘না, জানি না তো।’

এর মধ্যে দলটির অধিকাংশের খাওয়া শেষ হয়ে যায়। সঙ্গে আনা বোতলের পানি পান শেষে খাবারের প্লাস্টিকের বাক্স গুছিয়ে ব্যাগে বা ঝুলিতে রাখছিলেন। এর মধ্যে অনামিকা গঞ্জু (৩৫) নামের আরেক শ্রমিক বলেন, ‘কাছাকাছি আমরার খাওয়ার জন্যি, বিশ্রামের জন্যি কোনো ওজন ঘর (বিশ্রামের স্থান) নাই। এখন বৃষ্টি আইলে আমরা কীভাবে খাইতাম, এটা বুঝছেন?’

অনামিকার কথায় সুর মিলিয়ে কবিতা গঞ্জু (২৬) বললেন, ‘এভাবে খেয়ে আমরার প্রায়ই ডায়রিয়া হয়, তখন কাজে আইতাম ফারি না। বাগানের টয়লেটগুলান তো অনেক দূর-দূরে। আমরা অনেক দাবি করি, কিন্তু পাই কই?’

দলটির মধ্যে সবচেয়ে ছোট সদস্যের বয়স ২০ বছর হবে। তাঁর কাছে শ্রমিকদের সমস্যার কথা জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। তিনি ভয়ে ভয়ে বলেন, মাত্র আট দিন ধরে বাগানটিতে কাজ করছেন। পরিশ্রমের কাজটি শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। হাত-পায়ে ব্যথা করে, দুর্বল লাগে।

বাগানের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবার বিষয়ে জানতে চাইলে ওই নারীদের কয়েকজন বলেন, প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ তাঁরা সেখান থেকেই পান। তবে বড় কোনো সমস্যা হলে ছুটতে হয় চুনারুঘাট সদর, হবিগঞ্জ বা সিলেটে। সেখানকার চিকিৎসাসেবা তাঁদের জন্য ব্যয়বহুল। ফলে টাকার অভাবে শেষমেশ অনেকেরই চিকিৎসা নেওয়া হয় না। এ প্রসঙ্গে কবিতা বলে ওঠেন, ‘উনে (সেখানে) গেলে তো গেলাই, আর টাকা না থাকলেই তো মরবাই।’

শ্রমজীবী এসব নারী বলেন, তাঁরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জ্বর, শরীর ব্যথা, আমাশয় বা ডায়রিয়াতে বেশি ভোগেন। প্রাথমিকভাবে বাগানের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নেন।
কথায় কথায় সময় গড়ায়, ওই নারী শ্রমিকেরা বলেন, এবার তাঁদের যেতে হবে। নির্দিষ্ট পরিমাণে চা–পাতা তোলা না হলে দৈনিক হাজিরার পুরোটা (১৮৬ টাকা) তাঁরা পাবেন না। সেখান থেকে কেটে রাখা হবে কিছুটা অংশ।

পুরোনো মহাসড়কটির দুই পাশে সোনালু আর কৃষ্ণচূড়ার বর্ণিল রং দেখতে দেখতে খানিক পথ এগোই। এক টিলার ধারে দেখা হয় আরেক নারী শ্রমিকের সঙ্গে। ততক্ষণে আকাশে মেঘের ঘনঘটা। জানতে চাইলাম, ‘বৃষ্টি নামলে কী করেন?’ ভাঙা ভাঙা বাংলায় তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক কাগজ আছে, অইগুলা ঢাকায়া বয়া থাকি।’

কথার এই পর্যায়ে আপু সম্বোধন করে তাঁর নাম জানতে চাইতেই তিনি বললেন, ‘নাম কী করবেন, ভাই? চা–শ্রমিক লেখিয়া দেন!’

অদূরের এক টিলায় একাই কাজ করছিলেন ৬০ বছর পেরোনো ভারতী বাউরি। তাঁর দাবি, ৪০ বছর ধরে চা–শ্রমিকের কাজ করছেন। জানতে চাইলাম, ‘আজ যে চা দিবস, সে খবর জানেন?’ স্পষ্ট জবাব এল, না। দীর্ঘ এই সময় ধরে কাজ করলেও কাছাকাছি স্থানে কোনো বিশ্রামঘর বা টয়লেট না থাকায় আক্ষেপ করলেন। জানালেন, ঝড়বৃষ্টি এলে টিলার পর টিলা পেরিয়ে সবচেয়ে কাছের বিশ্রামঘরটিতে যেতে আনুমানিক আধা ঘণ্টা সময় লাগে। টয়লেটের দূরত্বও কম নয়।

চা–শ্রমিকদের জন্য সরকারি অনেক সহায়তা এলেও সবাই তা পান না বলে দাবি করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক নারী শ্রমিক। তিন বছর আগে তিনি স্বামীকে হারিয়েছেন। ছেলেরাও নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত।

ওই শ্রমিক বলেন, ‘কোটায় এবার মানুষ গরু-ছাগল পাইল। যাদের নাম আসে, এরারেই বারবার দিলাইব, আর মানুষ কী করছে? গরিব-দুঃখী তো আরও অনেক আছে।’

ততক্ষণে মেঘ কেটে গিয়ে হঠাৎ হঠাৎ সূর্য উঁকি দিচ্ছিল। এর মধ্যে নজর গেল পাশের সবচেয়ে উঁচু টিলায়, সেখানে চা–পাতা তুলছিলেন লাল শাড়ি পরা মধ্যবয়সী এক নারী। পাহাড় ডিঙিয়ে তাঁর কাছে গেলাম, তখন দরদর করে ঘামছিলেন তিনি। আঁচলে মুখখানা মুছে নাম জানালেন শকুন্তলা বাউরি (৫৫)। তাঁর কষ্ট দেখে আমি আক্ষেপ করছিলাম। তিনি বলে উঠলেন, ‘আমি যিতা কষ্ট করি, ছেলমেয়েরা এই কষ্ট না করুক। এর লাগি দুই মেয়ে আর এক ছেলে—সবাইরে হাইস্কুলে পড়তে দিছি। ধার করে হইলেও ওগো স্কুলে পাঠাই।’

শ্রমিকদের সমস্যা বিষয়ে জানতে চাইলে ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডের (এনটিসি) চন্ডিছড়া চা–বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক জান্নাতুল নাঈম বলেন, ‘শ্রমিকেরাই বাগানের মূল চালিকা শক্তি। আমরা তাদের যেকোনো সমস্যার সমাধানে আন্তরিক।

শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে প্রতি সপ্তাহের বুধবার চুনারুঘাট থেকে একজন এমবিবিএস চিকিৎসক আনা হয়। এ ছাড়া বেশির ভাগ বাগান টিলায় হওয়ায়, সেখানে বিশ্রামঘর বা টয়লেট নির্মাণ করা যায় না। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নেবে।’

হাইস্কুল না থাকার কথা স্বীকার করে জান্নাতুল নাঈম বলেন, বাগানের বাইরে কাছাকাছি হাইস্কুল আছে। সেখানে স্বল্প খরচে ছেলেমেয়েরা যেতে পারে। তবে প্রয়োজন হলে বাগানেও একটি হাইস্কুল করার কথা ভাবা হবে।