রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির

তহবিল–সংকটেও যেভাবে চলছে রোহিঙ্গা শিবিরের শিক্ষাকেন্দ্র

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোয় তহবিল–সংকটের মুখে পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রম-সংশ্লিষ্ট একাধিক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও)। দুশ্চিন্তা বেড়েছে শিবিরের রোহিঙ্গা শিশুদের লেখাপড়া নিয়ে। তবে সাময়িকভাবে কিছু শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ হলেও তা পুনরায় চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ জরুরি শিশু তহবিল-ইউনিসেফ।

রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা জানান, গত ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) অনুদান বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় এই সংকট দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান স্থগিত করায় বেশ কিছু এনজিও ইতিমধ্যে তাদের কর্মীদের ছাঁটাই করেছে। বেশকিছু শিক্ষাকেন্দ্রে ইউএসএআইডির তহবিল বন্ধ হয়ে গেছে। তহবিল সংকটে আশ্রয়শিবিরে শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি প্রকল্পসহ উন্নয়নমূলক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার জন্য চার হাজার লার্নিং সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তহবিলের ওপর নির্ভরশীল বেশ কিছু শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের পর এসব শিক্ষাকেন্দ্রে তহবিল বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে বলে শুনেছি। তবে এ পর্যন্ত কতটি শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ হয়েছে তার পরিসংখ্যান নেই। কেন্দ্রগুলো চালু রাখার বিষয়ে আলোচনা চলছে।’

তবে ইউনিসেফ বলেছে, বর্তমানে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের সব শিক্ষাকেন্দ্র সম্পূর্ণরূপে চালু রয়েছে। ক্যাম্প ৯ এ ইউএসএআইডির অর্থায়নে চলা মাত্র ৭৫টি কমিউনিটিভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল। তবে সেভ দা চিলড্রেন বিভিন্ন উৎস থেকে তহবিল নিশ্চিতের মাধ্যমে তা দ্রুততার সঙ্গে পুনরায় চালু করেছে।

ইউনিসেফ জানিয়েছে, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে মোট শিশুর সংখ্যাই ৪ লাখ। ৩১ জানুয়ারি ২০২৫ সাল পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এসব শিশুদের মধ্যে স্কুলে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৪ জন।

এনজিও সংস্থাগুলো বলছে, তহবিল–সংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের মাসিক খাদ্যসহায়তা কমতে পারে। এতে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন আরআরআরসির কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে আশ্রয়শিবিরগুলোয় শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এনজিও সংস্থার কর্মকর্তা ও রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্যসহায়তা কমানো হচ্ছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। আগামী এপ্রিল মাস থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কথা। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ফোরাম কক্সবাজারের সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী আবদুস শুক্কুর প্রথম আলোকে বলেন, খাদ্যসহায়তা কাটছাঁট করা হলে সংকট বাড়বে। পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৭) একটি পাহাড়ের ঢালুতে ত্রিপলের ছাউনির ছোট্ট ঘরে স্ত্রী ও পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে সাড়ে সাত বছর ধরে বসবাস করছেন রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা আবদুল গফুর। আশ্রয়শিবিরের সি ব্লকে বাঁশের বেড়ার একটি লার্নিং সেন্টারে পড়ছিল তাঁর দুই ছেলেমেয়ে। গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কেন্দ্রটিতে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়। তাতে ওই কেন্দ্রের ৪০ জন শিশুর পড়ালেখা বন্ধ আছে। আবদুল গফুর বলেন, ওই কেন্দ্রে তিন বছর ধরে তাঁর দুই সন্তান ইংরেজি, বর্মী ভাষা, গণিত রপ্ত করেছিল। কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ায় তাঁর সন্তানরা শেখানো পড়া ভুলে যাচ্ছে।

উখিয়ার ১১টি আশ্রয়শিবিরে ১৬২টি শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালনা করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা-সমাজ কল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থা-স্কাস। তহবিল–সংকটের মুখে অনেক শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান স্কাস চেয়ারম্যান জেসমিন প্রেমা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তহবিল–সংকটের কারণে আশ্রয়শিবিরে শিশু সুরক্ষা ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধের লক্ষ্যে ব্লকভিত্তিক গঠিত ৫৫টি রোহিঙ্গা কমিটি এবং ৩৪টি কিশোর-কিশোরী ক্লাবের কার্যক্রমও বন্ধ হয়েছে। জেসমিন প্রেমা বলেন, এসব কমিটির মাধ্যমে শিশুরা নিজেদের সুরক্ষা, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, শিশু ও কিশোর-কিশোরী পাচার এবং পারিবারিক সহিংসতা রোধে শিক্ষা পেয়ে আসছিল। শিক্ষাবঞ্চিত হলে বিপুলসংখ্যক শিশু-অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

সংশোধনী:

‘রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ১ হাজার শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ, ঝুঁকিতে ৪ লাখ রোহিঙ্গা শিশু’ এই শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল ১২ মার্চ। তবে তথ্যগত বিচ্যুতি থাকায় সেটি নতুন শিরোনামে পুনরায় প্রকাশিত হলো।