
গত বছরের ঈদের দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন মোহাম্মদ নুর হোসেন। ভ্যানে করে অলিগলি ঘুরেছেন। দিন শেষে তাঁর কাছে জমেছিল প্রায় ২৯০টি গরুর চামড়া।
প্রতিটি চামড়া কিনেছিলেন গড়ে ৭০০ টাকা দরে। আশা করেছিলেন, কিছু লাভ থাকবে। অন্তত খরচ উঠে আসবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই হিসাব মেলেনি। চামড়াগুলো বিক্রি করতে হয়েছিল মাত্র ১৫০ টাকা দরে। এক দিনেই প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয় তাঁকে। সেই ক্ষতির স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেননি নুর হোসেন। তাই এবার আর চামড়ার ব্যবসায় নামছেন না। আজ বুধবার মুঠোফোনে নুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছর চামড়া নিয়ে বিপদে পড়েছিলাম। খরচ ওঠানো তো দূরের কথা, উল্টো বড় লোকসান হয়েছে। তাই এবার আর চামড়া কিনব না।’
ঢাকার ট্যানারি মালিক ও আড়তদারের কাছে আমাদের ২৫ কোটি টাকা আটকে আছে। ২০১৪ সাল থেকে এ টাকা জমেছে। বছরের পর বছর ঘুরেও টাকা পাওয়া যায় না। আবার চামড়া নেওয়ার সময় নানা অজুহাতে পরিমাণে কাটছাঁট করা হয়। অনেক সময় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয়। এতে ব্যবসায়ীরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হন।মোহাম্মদ ইউনুছ, চামড়া আড়তদার।
শুধু নুর হোসেন নন। চট্টগ্রামের অনেক মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীর মুখে এবার একই ধরনের হতাশা। গত ঈদে মৌসুমি বিক্রেতারা প্রত্যাশিত দাম পাননি। কেউ গরুর চামড়া কেনা দামের অর্ধেকেরও কমে বিক্রি করতে বাধ্য হন। আবার কেউ শেষ পর্যন্ত কোনো ক্রেতাই পাননি। নগরের বিভিন্ন এলাকায় সড়কের পাশে, অলিগলিতে ও আবর্জনার ভাগাড়ে চামড়া ফেলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। কেউ লোকসান কমাতে দ্রুত কম দামে চামড়া ছেড়ে দেন। কেউ আবার চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেন। সব মিলিয়ে গত বছরের লোকসানের ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী। তাই এবার অনেকে ব্যবসা থেকেই সরে দাঁড়াচ্ছেন।
গত বছর নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ২০০ চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন মোহাম্মদ রুবেল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই চামড়া বিক্রি করতে না পেরে সিটি করপোরেশনের আবর্জনার গাড়িতে ফেলে দিতে হয়েছিল তাঁকে। প্রায় ৯০ হাজার টাকা লোকসান হয় তাঁর। এবার চামড়া কিনবেন কি না—এমন প্রশ্নে রুবেল বলেন, ‘এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি। পরিস্থিতি দেখে হয়তো ৫০টার মতো চামড়া কিনতে পারি।’
ঈদের দিন চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বাসাবাড়ি, পাড়া-মহল্লা থেকে চামড়া সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো নিয়ে যান নগরের চৌমুহনী এলাকায়। সেখানে চলে অস্থায়ী বেচাকেনা। এরপর আড়তদার কিংবা তাঁদের প্রতিনিধিরা চামড়া নিয়ে যান আতুরার ডিপো এলাকার বড় আড়তে। গত বছর ঈদের দিন আড়তের সামনে চামড়া ফেলে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
চামড়ার সবচেয়ে বড় সংকট এখন বাজারে আস্থার অভাব। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানেন না, শেষ পর্যন্ত তাঁরা ন্যায্য দাম পাবেন কি না। আবার আড়তদারেরাও নিশ্চিত নন, ঢাকার ট্যানারি মালিকেরা কী দামে চামড়া কিনবেন। এ কারণে পুরো বাজারে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের ভাষ্য, অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবার চামড়া কেনার সাহস পাচ্ছেন না। গত বছরের লোকসানের ধাক্কা এখনো কাটেনি। কারও পুঁজি শেষ হয়ে গেছে। কেউ ঋণের চাপ সামলাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে চট্টগ্রামে চামড়ার ব্যবসা আরও ছোট হয়ে যাবে।
সরকার প্রতিবছর চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও বাজারে সেই দাম কার্যকর হয় না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। এ বছর ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা। গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। ঢাকার বাইরে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। এ ছাড়া খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাগজে-কলমে দাম বাড়লেও মাঠপর্যায়ে সেই প্রভাব খুব একটা দেখা যায় না।
হালিশহর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইফুল আলম গত বছর ৩০০ চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। গড়ে দাম পড়েছিল ৭০০ টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হন। তবু এবার ব্যবসায় থাকছেন তিনি। তবে ঝুঁকি কম নিচ্ছেন। সাইফুল বলেন, ‘এবার বড় গরুর সর্বোচ্চ ১০০ চামড়া নেব। দুপুরের মধ্যেই বিক্রি করার চেষ্টা করব। দেরি হলে দাম আরও পড়ে যায়।’
আতুরার ডিপো এলাকার চামড়া আড়তদার মোহাম্মদ ইউনুছ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ীরা কয়েক বছর ধরে টিকে থাকার লড়াই করছেন। আমরা কাঁচা চামড়া কিনে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করি। কিন্তু এখন লবণের দামই অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। ৭৪ কেজির এক বস্তা লবণ কিনতে প্রায় ৯৫০ টাকা লাগছে। অথচ ১৫ দিন আগে এ দাম ছিল ৭০০ টাকা। একটি গরুর চামড়া ঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে ১০ কেজির মতো লবণ লাগে। এতে খরচ অনেক বেড়ে যায়।’
মোহাম্মদ ইউনুছ আরও বলেন, ‘সমস্যা শুধু খরচে নয়। ঢাকার ট্যানারি মালিক ও আড়তদারের কাছে আমাদের ২৫ কোটি টাকা আটকে আছে। ২০১৪ সাল থেকে এ টাকা জমেছে। বছরের পর বছর ঘুরেও টাকা পাওয়া যায় না। আবার চামড়া নেওয়ার সময় নানা অজুহাতে পরিমাণে কাটছাঁট করা হয়। অনেক সময় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয়। এতে ব্যবসায়ীরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হন।’
চট্টগ্রাম বৃহত্তর কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি জানিয়েছে, তাদের সদস্য ১১২ জন। এবার চামড়া কিনছেন ৪০ জনের মতো আড়তদার। চট্টগ্রাম জেলায় সব মিলিয়ে ৪ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকার ট্যানারি মালিকেরা ঠিকমতো দাম দিতে চান না। ফলে আড়তদারেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আগে আমাদের সমিতিতে ১১২ জন আড়তদার ছিল। এখন অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।’ চামড়া কেনার ক্ষেত্রে মৌসুমি বিক্রেতাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘গত বছর ৯৫ শতাংশ চামড়া ব্যবসায়ী লোকসান দিয়েছেন। তাই এবার হিসাব করে চামড়া কিনতে হবে। বেশি দামের আশায় থাকলে বিপদে পড়তে পারেন।’