গত বছরের ৩০ নভেম্বর যশোর সদর উপজেলার মধুগ্রাম লিটন গাজীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি। এর মধ্যে রয়েছে ৭ দশমিক ৬৫ বোরের পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, পিস্তলের ১০টি ম্যাগাজিন ও ৫০টি গুলি
গত বছরের ৩০ নভেম্বর যশোর সদর উপজেলার মধুগ্রাম লিটন গাজীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি। এর মধ্যে রয়েছে ৭ দশমিক ৬৫ বোরের পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, পিস্তলের 
১০টি ম্যাগাজিন ও ৫০টি গুলি

যশোর

আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়াচ্ছে শঙ্কা

চলতি বছরের শুরুতে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নির্বাচনে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়তে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যশোরে গত চার বছরে ২৪৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গুলি করে ১৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কয়েক দিন আগে চলতি বছরের শুরুতে গুলি করে দুজনকে মারা হয়। বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডে ৭.৬৫ মিলিমিটার বোরের পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা।

পুলিশ জানায়, গত এক বছরে ১৩টি অভিযানের মাধ্যমে ১৯টি বিদেশি পিস্তল, ৪টি দেশি পিস্তল, ২৯০টি গুলি, ৪টি কার্তুজ, ওয়ানশুটার গান ও ৮টি পাইপগান জব্দ করেছে পুলিশ। এসব অস্ত্র ভারত থেকে অবৈধভাবে সীমান্ত দিয়ে যশোরে ঢুকেছে। জব্দ করা অস্ত্রের প্রায় সবই ৭.৬৫ মিলিমিটারের পিস্তল।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত। ইতিমধ্যে কিছু অস্ত্র, গুলি ও ম্যাগাজিন উদ্ধার হয়েছে। সন্ত্রাসীদের প্রায় সবাই পলাতক। নির্বাচনের আগে-পরে কোনো ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির সক্ষমতা কারও নেই।

তবে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর-৩ (সদর) আসনের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, তাঁরা বারবার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের জন্য তাগিদ দিচ্ছেন। কিন্তু পুলিশের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। সামনে নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

কোন বছরে কত হত্যা

পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের পর ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি ৮৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওই বছর গুলি করে হত্যার চারটি মামলা রেকর্ড হয়। এ ছাড়া ২০২২ সালে ৫৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ২টি, ২০২৩ সালে ৪২টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ২টি, ২০২৫ সালে ৬০টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৩টি ও চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহে ৩টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ২ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর নিহত ৬০ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পারিবারিক কলহে ১২ জন, আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে ৭ জন, মাদক ব্যবসার বিরোধে ৩ জন, পূর্বশত্রুতার জেরে ৪ জন নিহত হন। এ ছাড়া জমিজমা, পরকীয়াসহ অন্যান্য ঘটনায় ২৮ জনের মৃত্যু হয়। ছুরি-চাকু দিয়ে কুপিয়ে, পিটিয়ে ও গুলি করে এসব হত্যা করা হয়। ৬০টি মামলায় এজাহারভুক্ত ও সন্দেহভাজন আসামি ১৭৭ জন। এর মধ্যে ২৫ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সন্ত্রাসীদের প্রায় সবাই পলাতক। নির্বাচনের আগে-পরে কোনো ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির সক্ষমতা কারও নেই।
সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার, যশোর

আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ১৩টি হত্যা

চার বছরে গুলি করে হত্যা করা ১৩ জনের মধ্যে কয়েকজনের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসায়িক ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহেই দুজনকে গুলি করে হত্যার পর সম্প্রতি আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে যশোরে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাতেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য ও প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, যশোরে অস্ত্রের সহজলভ্যতা সব সময় ছিল। সীমান্ত অতিক্রম করে এসব অস্ত্র যশোরে ঢোকে। সেনাবাহিনী, র‍্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযান অব্যাহত আছে। নির্বাচনের আগে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের জন্য অস্ত্রের ব্যবহার রুখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর থাকতে হবে। 

৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে (৫৫) গুলি করে হত্যা করা হয়। দুই দিন পর ৫ জানুয়ারি বিকেলে মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে রানা প্রতাপ বৈরাগী (৪০) নামের এক ব্যবসায়ী হত্যা করা হয়। পুলিশ বলছে, স্থানীয় আধিপত্য ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটে।

২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি বিকেলে বাঘারপাড়া উপজেলায় আওয়ামী লীগের কর্মী আবু হানিফকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৮ মার্চ রাতে যশোর শহরের রেলগেট এলাকায় গুলিতে মীর সামিল সাকিব (৩৫) নামের যুবলীগের বহিষ্কৃত এক নেতা নিহত হন। ৪ সেপ্টেম্বর রাতে অভয়নগর উপজেলার শুভরাড়া গ্রামে শামীম শেখ নামের একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। 

তাঁরা বারবার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের জন্য তাগিদ দিচ্ছেন। কিন্তু পুলিশের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
অনিন্দ্য ইসলাম, বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর-৩ আসনের প্রার্থী

২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি শার্শা উপজেলার ধান্যখোলা সীমান্ত থেকে রইসুদ্দীন নামের বিজিবির এক সৈনিকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর ৭ জুন রাতে সদর উপজেলার বাহাদুরপুর এলাকায় আলী হোসেন নামের একজনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে ৯ আগস্ট রাতে সদর উপজেলার বাদিয়াটোলা গ্রামে মেহের আলী (৪৫) নামের এক প্রবাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

২০২৩ সালের ১১ জানুয়ারি অভয়নগর উপজেলার দামুখালি গ্রামে সুব্রত মণ্ডল (৫২) নামের একজনকে এবং ১৬ অক্টোবর মনিরামপুরে উদয় শংকর বিশ্বাস (৪২) নামের যুবলীগের এক নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০২২ সালের ৮ জানুয়ারি তৃতীয় লিঙ্গের লাভলীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে ১২ মে অভয়নগর উপজেলার দত্তগাতি গ্রামে খন্দকার রকিবুল ইসলাম নামের একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

কোন ধরনের অস্ত্র দিয়ে হত্যা

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৩টি হত্যাকাণ্ডের ১০টিই ৭.৬৫ মিলিমিটার পিস্তল দিয়ে করা হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে নিহত দুজনকেও একই ধরনের অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ ধারণা করছে।

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার বলেন, রানা প্রতাপের মাথায় যে গুলি করা হয়েছে, সেটির খোসা দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলটি ছিল ৭.৬৫ বোরের। এ ছাড়া আলমগীর হোসেনকেও একই ধরনের পিস্তল দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, গত বছর উদ্ধার হওয়া ১৯টি পিস্তলের মধ্যে ১৭টিই ৭.৬৫ বোরের পিস্তল। এসব পিস্তল সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে দেশে আসছে। পিস্তলের গায়ে ‘মেইড ইন ইতালি বা ইউএসএ’ লেখা থাকলেও অরিজিনাল পিস্তলের সঙ্গে পার্থক্য আছে। ধারণা করা হচ্ছে, আশপাশের কোনো দেশের সীমান্তে এগুলো তৈরি হচ্ছে।

২০২২–২৩ সালের চারটি হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক উপপরিদর্শক মফিজুল ইসলাম। তিনি এখন পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ৪টি হত্যাকাণ্ডেই ৭.৬৫ বোরের পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ইকবাল কোভিদ জাহিদ বলেন, গণ–অভ্যুত্থানে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তেমন তৎপরতা দেখায়নি। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, তত লুট করা ও সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে খুনোখুনি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার একেবারেই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে।