
সন্ধ্যা নামার আগেই সড়কের পাশে কয়েকটি সারি হয়ে ফুটপাতে চেয়ারে বসে আছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ রিকশাচালক, কেউ দিনমজুর, কেউ ভিক্ষুক, কেউবা ছিন্নমূল মানুষ। একটা থালায় ডিম–খিচুড়ি, খেজুর, জিলাপি ও মুড়ি দিয়ে হবে তাঁদের ইফতার।
এমন দৃশ্য শুধু এক দিনের নয়, রমজান মাসজুড়েই চলে। জামালপুর শহরের শহীদ হিরু সড়ক মোড় এলাকায় ‘ইউনাইটেড সোসাইটি ক্লাব জামালপুর’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন টানা চার বছর ধরে এই ইফতারের আয়োজন করছে।
এ বছর প্রতিদিন ১৫০–২০০ জনের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে। অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষদের সহযোগিতার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ‘ইউনাইটেড সোসাইটি ক্লাব জামালপুর’ প্রতিষ্ঠা করেন ফারুক হোসেন। সংগঠনে ৫০ জন সদস্য ও ১৬ জন উপদেষ্টা আছেন। এসব সদস্যের সহযোগিতায় প্রতিবছর ইফতারের আয়োজন করা হয়। তাঁদের এই কার্যক্রমে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই শরিক হন; দেন আর্থিক সহায়তা। ২০২২ সাল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইফতারি বিতরণ শুরু করা হয়। শুধু বিনা মূল্যে ইফতারি নয়, বিভিন্ন সময় ভানবাসীদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, মুমূর্ষু রোগীকে রক্তদান, এতিম শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার খরচ ও শীতার্তদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার গিয়ে দেখা যায়, আসরের নামাজের পর থেকে ইফতারের আগমুহূর্ত পর্যন্ত জামালপুর শহরের শহীদ হিরু সড়ক মোড় এলাকায় ইফতারি বিতরণ করা হচ্ছে। সড়কের পাশে ফুটপাতে ত্রিপলের ছাউনি। সেখানে অনেক মানুষের জটলা। চেয়ারে বসে অনেকেই অপেক্ষায়; আবার অনেকের হাতে ইফতারির থালা। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ও বসে ইফতারি নিচ্ছেন। সংগঠনের সদস্যরা ইফতারির থালা নিয়ে তুলে দিচ্ছেন মানুষের হাতে। এ কাজে স্বেচ্ছাশ্রমে কয়েকজন তরুণ সহযোগিতা করছেন।
জামালপুর সদর উপজেলার তুলশীরচর এলাকা থেকে শহরে ইজিবাইক নিয়ে এসেছেন খাইরুল ইসলাম। ইফতারের সময় এসে গেছে। কোথায় ইফতার করবেন, তা ভাবছিলেন খাইরুল। যাত্রী নামানোর সময় তাঁর চোখে পড়ে ইফতারি বিতরণের দৃশ্য। পরে সড়কের পাশে ইজিবাইক রেখে সেখানেই তিনি ইফতার করেন। খাইরুল বলেন,‘আগের মতো এখন আর ভালো মানুষ খুঁজেই পাওয়া যায় না। এইখানে ইফতার করলাম আর শুনলাম যে সারা মাসই ইফতারি খাওয়ানো হবে। ইফতারির মানও ভালো। থালায় ডিম–খিচুড়ি, দুটি খেজুর, জিলাপি, তরমুজ, ছোলা আর মুড়ি ছিল। পেট ভরে খাইছি।’
ইফতার করতে আসা আরও কয়েকজন রোজাদার বলেন, এখানে বসে একসঙ্গে ইফতার করার মধ্যে অন্য রকম তৃপ্তি আছে। অনেকের পক্ষেই প্রতিদিন এত আয়োজন করা সম্ভব হয় না। এ উদ্যোগ তাঁদের জন্য বড় সহায়। প্রতিদিন এই আয়োজন পথচারী, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর ও ছিন্নমূল মানুষের জন্যে কত বড় উপকার, সেটা শুধু তাঁরাই বুঝতে পারেন।
জামালপুর শহরের জিগাতলা এলাকার ভ্যানচালক মুহাম্মদ আজগর আলী বলেন,‘পয়সা ছাড়া খাওয়া এখন কল্পনাও করা যায় না। এই দিনেও পয়সা ছাড়া খাওয়া পাওয়া যায়, এইখানে না আইলে বুঝতেই পারতাম না। এইখানে ধনী-গরিব অনেকেই ইফতার করতেছেন। ভেদাভেদ নাই। ইফতারিও অনেক ভালো। খায়া অনেক শান্তি পাইলাম।’
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন,‘প্রতিদিন আলাদা আলাদা মেনুতে ইফতারি দেওয়া হয়। কোনো দিন ডিম–খিচুড়ি, কোনো দিন সবজি–খিচুড়ি, এর সঙ্গে থাকে নানা পদের ইফতারসামগ্রী। প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ মানুষ এখানে ইফতার করেন। এই আয়োজনে সংগঠনের সবাই আর্থিক সহযোগিতা করেন। এ ছাড়া অনেকে স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করে থাকেন। এভাবেই আমরা মানুষের সেবায় কাজ করে যেতে চাই।’