ঘরে ঘরে এখন জ্বরের প্রকোপ। তবে জ্বরের কিছু লক্ষণে সচেতন হতে হবে অভিভাবকদের। ছবিটি প্রতীকী
ঘরে ঘরে এখন জ্বরের প্রকোপ। তবে জ্বরের কিছু লক্ষণে সচেতন হতে হবে অভিভাবকদের। ছবিটি প্রতীকী

ঘরে ঘরে জ্বর, সতর্ক হবেন যে লক্ষণে

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বহির্বিভাগে পাঁচ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন সাবরিনা আক্তার। কয়েক দিন ধরে তাঁর মেয়ের কিছুতেই জ্বর কমছিল না। একসময় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি। বিশেষ করে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ নিয়ে খবর শুনে মেয়ের জ্বরের কারণ নিয়েও ভয় তৈরি হয় তাঁর মনে।

সাবরিনা আক্তার জানান, প্রথমে দুদিন অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু জ্বর না কমায় আর দেরি করেননি। মেয়েকে নিয়ে চলে আসেন হাসপাতালে। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর অবশ্য কিছুটা স্বস্তি ফিরে পান তিনি। চিকিৎসক তাঁকে জানান, মেয়ের জটিল কোনো সমস্যা নেই। নিয়মিত ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যায় সে সুস্থ হয়ে উঠবে।

সাবরিনা আক্তার জানান, সম্প্রতি তাঁর নিজেরও জ্বর হয়েছিল। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ নিয়ে নিয়মিত খবর শুনছিলেন তিনি। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবরগুলো তাঁকে আরও চিন্তিত করে তোলে। তাই মেয়ের জ্বর দেখা দেওয়ার পর ঝুঁকি না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াকেই নিরাপদ মনে করেছেন তিনি।

তবে সাবরিনা আক্তার একা নন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বহির্বিভাগ ও মেডিসিন বহির্বিভাগে প্রতিদিনই জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গ নিয়ে আসছেন নানা বয়সী রোগী। শিশুদের পাশাপাশি তরুণ, মধ্যবয়সী ও বয়স্ক রোগীদেরও দেখা যাচ্ছে এসব উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে। কারও কয়েক দিন ধরে জ্বর, কারও সঙ্গে রয়েছে সর্দি-কাশি বা শরীরব্যথা।

চিকিৎসকেরা বলছেন, এ সময়ে মৌসুমি জ্বর, সর্দি-কাশি ও ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ দেখা যায়। তবে একই সময়ে ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণও থাকায় জ্বরকে সাধারণ মৌসুমি অসুস্থতা ধরে নিয়ে অবহেলা করা ঠিক নয়। শিশু কিংবা যেকোনো বয়সী কারও টানা জ্বর, সর্দি-কাশি বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

এ সময়ে জ্বরের প্রাদুর্ভাব বেশি কেন

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে জ্বর, সর্দি ও কাশির রোগী বাড়ে। আবহাওয়ার পরিবর্তন, তাপমাত্রার ওঠানামা এবং বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে এ সময়ে শ্বাসতন্ত্রের নানা সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে জ্বর, সর্দি ও কাশির প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ কয়েক দিন পর নিয়মিত পরিচর্যা ও চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়।

তবে জ্বর হলেই সেটিকে সাধারণ জ্বর ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, জ্বর নিজে কোনো রোগ নয়। বরং শরীরে কোনো সমস্যা বা সংক্রমণের একটি উপসর্গ। ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ছাড়াও শরীরে প্রদাহ, বিভিন্ন রোগ কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণেও জ্বর হতে পারে। এমনকি শরীরে আঘাতের পরও প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়ায় জ্বর দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, জ্বর দেখা দিলে প্রথমেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার জ্বরকে সাধারণ মৌসুমি সমস্যা ভেবে একেবারে অবহেলাও করা ঠিক নয়। জ্বর হলে প্রথমে রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে। শরীরে পানিশূন্যতা যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শরীরের তাপমাত্রা নিয়মিত মাপা এবং জ্বরের সঙ্গে নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কি না, সেটিও লক্ষ করতে হবে।

পানিশূন্যতা এড়াতে ফোটানো পানি, খাবার স্যালাইন, স্যুপ বা অন্যান্য তরল খাবার দেওয়া যেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে খাবার ও পানি খাওয়ানোর বিষয়টি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা জরুরি। জ্বর কমানোর জন্য নিজের মতো করে বিভিন্ন ওষুধ শুরু করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

আতঙ্ক বাড়াচ্ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ

ঘরে ঘরে জ্বরের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি মো. আবু তৈয়বের অভিজ্ঞতাও তেমন। তিনি বাঁশখালী উপজেলা থেকে জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আবু তৈয়ব জানান, প্রথমে তাঁর পুরো শরীরে ব্যথা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে জ্বর আসে। জ্বর ও শরীরের ব্যথা বাড়তে থাকায় একপর্যায়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদেরও জ্বরের পাশাপাশি ডেঙ্গুর বিভিন্ন উপসর্গ ছিল। ঘরে ঘরে জ্বর এবং ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার খবর শুনে কেউ কেউ হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করান। পরে তাঁদের কারও কারও ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। চিকিৎসা নেওয়ার পর এখন আগের তুলনায় তাঁদের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন চার হাজার ৪৬৬ জন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরেই আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৪৩০ জন। একই মাসে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৬ জন। এ বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২১। অর্থাৎ এ বছরের মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর বড় অংশই ঘটেছে সেপ্টেম্বর মাসে।

এদিকে নগরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ছে। সেপ্টেম্বর মাসে নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের হিসাবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই দিনই নতুন করে ৩১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন, ভর্তি ছিলেন মোট ৮৭ জন। চলতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৮৫১ জন। সুস্থ হয়েছেন এক হাজার ৬৬৯ জন।

সংক্রমণের এই পরিস্থিতির মধ্যে নগরে এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়েও অভিযান চালাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশক নিধন কার্যক্রম যথেষ্ট নয়; বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশে পানি জমতে না দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। নগরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ মশক নিধন অভিযান ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

হাম নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ

ডেঙ্গুর পাশাপাশি শিশুদের জ্বরের সঙ্গে শরীরে র‍্যাশ দেখা দেওয়ায় হাম নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে জ্বর, সর্দি-কাশি ও শরীরে র‍্যাশ নিয়ে শিশুদের চিকিৎসা নিতে আসতে দেখা যাচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হচ্ছে, আবার অনেক শিশুকে হাম সন্দেহে পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হাম সন্দেহে ভর্তি ছিল ২৫৫ জন। এর মধ্যে নগরের হাসপাতালে ছিল ২৫০ জন। সেদিন পর্যন্ত হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬। তবে এ পর্যন্ত ৭৪৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হাম সন্দেহে ২৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

শিশুদের ক্ষেত্রে হাম নিয়ে উদ্বেগের কারণ আরও স্পষ্ট হয়েছে চট্টগ্রামে পরিচালিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণায়। এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের তৃতীয় গবেষণা প্রকল্পে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও কুমিল্লার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় মোট ৩০০টি নমুনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৯৬টি ছিল শুধু শিশুদের এবং ১০৪টি ছিল মা ও শিশুর নমুনা।

গবেষণার উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি হলো, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতালে অবস্থানকালে সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলোতে শয্যার সংকট এবং একই জায়গায় একাধিক শিশুর অবস্থানের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আক্রান্ত শিশুদের ৪৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। অর্থাৎ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের প্রথম টিকা দেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই তারা আক্রান্ত হয়েছে। এ কারণে গবেষক দল হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার বয়স ছয় মাস করার সুপারিশ করেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ১৯৬ শিশুর মধ্যে ৫১ জন বা ৩১ শতাংশের মাঝারি থেকে তীব্র অপুষ্টি ছিল।

মুখ্য গবেষক কামরুন নাহার বলেন, হামের ক্ষেত্রে শুধু সংক্রমণ নয়, শিশুর পুষ্টিগত অবস্থাও রোগের তীব্রতা ও জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশের মাঝারি থেকে তীব্র অপুষ্টি পাওয়া গেছে। তাই হাম প্রতিরোধে টিকাদানের পাশাপাশি শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

আতঙ্কও নয়, আবার অবহেলা নয়

চিকিৎসকদের মতে, জ্বরের কারণ একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে এটি সাধারণ মৌসুমি সংক্রমণের অংশ, আবার কারও ক্ষেত্রে ডেঙ্গু, হাম বা অন্য কোনো রোগের উপসর্গ হতে পারে। তাই শুধু জ্বরের তীব্রতা নয়, এর সঙ্গে থাকা অন্যান্য উপসর্গ এবং জ্বর কত দিন ধরে রয়েছে, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।

চিকিৎসকেরা বলছেন, জ্বর হলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে শারীরিক অবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। তবে জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বারবার বমি, খিঁচুনি, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, শরীরে রক্তপাত, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা শরীরে র‍্যাশের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ দেখা দিলে আরও দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) কাজী আশিক আমান বলেন, জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। জ্বর হলে প্রথম দুই থেকে তিন দিন অন্যান্য লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এ সময় পর্যাপ্ত তরলজাতীয় খাবার খেতে হবে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে হবে। নিজের ইচ্ছায় কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না।