ওষুধ নিচ্ছেন রোগীরা। সম্প্রতি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরাঞ্চল ২০ শয্যা হাসপাতালে
ওষুধ নিচ্ছেন রোগীরা। সম্প্রতি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরাঞ্চল ২০ শয্যা হাসপাতালে

রোগীরাই যেন ‘চিকিৎসক’, তাঁদের কথাতেই দেওয়া হয় ওষুধ

কলাপসিবল গেটের সামনে রোগীদের লাইন। ভেতরে নেই কোনো চিকিৎসক। রোগীরাই জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে বলে দিচ্ছেন কার কী ওষুধ দরকার! কারও দরকার প্যারাসিটামল, কারও গ্যাসের বড়ি, ব্যথার বড়ি, কারও বা চুলকানির ওষুধ। আর সে অনুযায়ী হাত বাড়িয়ে ওষুধ তুলে দিচ্ছেন হাসপাতালের কর্মীরা। যেন রোগীরাই এখানে ‘চিকিৎসক’।

ময়মনসিংহের চরাঞ্চলের একটি সরকারি হাসপাতালে গত ২৩ এপ্রিল সরেজমিনে দেখা যায় এমন চিত্র। ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরের হাসপাতালটির নাম ‘চরাঞ্চল ২০ শয্যা হাসপাতাল’।

চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কথা চিন্তা করে গড়া হাসপাতালটিতে ২৩ এপ্রিল কোনো চিকিৎসকের উপস্থিতি দেখা যায়নি। অথচ চরাঞ্চলের লাখো মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল হয়ে ওঠার কথা ছিল হাসপাতালটির।

চরাঞ্চল ২০ শয্যা হাসপাতাল। সম্প্রতি তোলা ছবি

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পরানগঞ্জ বাজারের কাছে ২০০৬ সালে এই হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়দের দান করা তিন একর জমিতে গড়ে তোলা দ্বিতল ভবনে নারীদের জন্য ১২টি ও পুরুষদের জন্য ৮টি শয্যা থাকার কথা। হাসপাতালটিতে চিকিৎসক-কর্মচারীদের জন্য আছে চারটি আবাসিক ভবনও। কিন্তু প্রায় দুই দশকেও পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হয়নি। বহির্বিভাগে কিছু ওষুধ বিতরণ ছাড়া কার্যত কোনো চিকিৎসাসেবা নেই।

রোগীদের চাওয়া অনুযায়ী ওষুধ বিতরণ

২৩ এপ্রিল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে দেখা যায়, রোগীরা গেটের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে নাম লেখাচ্ছেন। ওয়ার্ড বয় মো. হাসিম উদ্দিন খাতায় নাম লেখার পর রোগীরা পাশের জানালায় গিয়ে নিজেরাই বলে দিচ্ছেন কী ওষুধ লাগবে। মাস্টার রোলে কর্মরত আয়া শাহিনা আক্তার সেই অনুযায়ী ওষুধ তুলে দিচ্ছেন। অথচ রোগী দেখে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দেবেন এবং সেই অনুযায়ী ফার্মাসিস্ট ওষুধ বিতরণ করবেন—এটাই নিয়ম।
দেখা যায়, ছাতিয়ানতলা গ্রামের জান্নাত আক্তার গ্যাসের বড়ি, স্যালাইন ও ডায়রিয়ার ওষুধ চান। তাঁর কথামতো ওষুধও পেয়ে যান তিনি। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার দেহাইছি না। কইছি ওষুধ দিত, ওষুধ দিয়া দিছে।’

ওষুধ নিয়ে ফেরার পথে কথা হয় মুর্শিদা বেগম নামের এক নারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সকাল ৯টায় আইছি, লোকজন দেরিতে আসে। বড় ডাক্তার আইতে দেহি না। আমরা যা চাই, তা-ই দেয়।’

হাসপাতালে এসেছিলেন সুফিয়া আক্তার নামের এক নারী। তিনি বলেন, ‘পেটের ব্যথার কথা কইছি, ওষুধ দিছে। এইনো চিকিৎসা করে না, শহরে যাইতে হয়।’

বোররচর গ্রামের ফাতেমা আক্তার বলেন, ‘এইনো কোনো চিকিৎসা নাই। এইনো জ্বর, পেট নামা ও গ্যাসের কয়টা ওষুধ দেয়। বুকটা ধরফর করতাছে এইতার কোনো চিকিৎসা নাই। এইন ডাক্তার নাই কারে দেহামু। আমরা পয়সার ডরে ময়মনসিংহ যাবার পারি না, অনেক অসুখ এইন ডাক্তার থাকলে তো বালা অইতো।’

ডাক্তার দেহাইছি না। কইছি ওষুধ দিত, ওষুধ দিয়া দিছে।
জান্নাত আক্তার, ছাতিয়ানতলা গ্রামের বাসিন্দা
এভাবে ওষুধ দিলে রোগী রোগের সঠিক ওষুধ নাও পেতে পারেন বা ওষুধের যে পূর্ণাঙ্গ ডোজ, সেটা মিস হতে পারে।
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান খান, সহযোগী অধ্যাপক, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ

হাসপাতাল সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার ২৬৩ জন, বুধবার ২২৪ জন, মঙ্গলবার ২৫৪ জন ও সোমবার ২৮১ জন রোগী ওষুধ নিয়েছেন।

২০২০ সাল থেকে হাসপাতালে ফার্মাসিস্ট হিসেবে কর্মরত মিন্টু চন্দ্র দে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ রোগীর ওষুধ দেওয়া হয়। রোগীরা লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁদের সমস্যার কথা বলেন, আমরা ওষুধ দিয়ে দিই। রোগীরা ডাক্তারের কাছে প্রেসক্রিপশনের জন্য আসেন না। সর্বোচ্চ ২-৪ জন প্রেসক্রিপশন করাতে আসেন। অধিকাংশ রোগী নিজেদের সমস্যার কথা বলে ওষুধ নিয়ে যান।’ তিনি আরও বলেন, ‘রোগীরা বললে ওষুধ দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু আমি যোগদানের পর থেকে এভাবে ওষুধ দেওয়া হয় দেখেছি। এখনো এভাবে চলছে!’

জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি

চিকিৎসকেরা বলছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ দেওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, নিয়ম হচ্ছে একজন চিকিৎসক রোগী দেখে রোগনির্ণয় করবেন এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেবেন। চিকিৎসক ছাড়া ওষুধ দেওয়াটা জনস্বাস্থের জন্য হুমকি। তিনি বলেন, ‘এভাবে ওষুধ দিলে রোগী রোগের সঠিক ওষুধ নাও পেতে পারেন বা ওষুধের যে পূর্ণাঙ্গ ডোজ, সেটা মিস হতে পারে।’

জনবলসংকট

হাসপাতাল সূত্র জানায়, পাঁচজন চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে দুজন কর্মরত। তাঁদের মধ্যে আরএমও নবারুন বিশ্বাস ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট আজিম উদ্দিনকে (হীরা) বৃহস্পতিবার হাসপাতালে পাওয়া যায়নি।

হাসপাতালের কর্মীদের ভাষ্য, একজন অসুস্থ, অন্যজন জরুরি কাজে বাইরে গেছেন। প্রায় দুই বছর আগে গাইনি চিকিৎসক নিবেদিতা রায় (দোলা) সংযুক্তিতে অন্যত্র চলে যাওয়ার পর থেকে প্রসূতি সেবা বন্ধ। অন্য দুই চিকিৎসকের একজন ছয় মাস এবং অন্যজন দুই মাস আগে অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে নবারুন বিশ্বাসের মুঠোফোনে ফোন করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

এভাবে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম

বাক্সবন্দী যন্ত্রপাতি

হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, অবকাঠামো থাকলেও ব্যবহার নেই। দোতলায় নারী-পুরুষ ওয়ার্ড, নার্স স্টেশন ও অপারেশন থিয়েটার ধুলায় ঢেকে আছে। অপারেশন থিয়েটারে টেবিল নেই, যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দী অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে। ফার্মাসিস্ট মিন্টু চন্দ্র দে বলেন, ‘যা ছিল, অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেছে, কিছু অন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।’

অন্তর্বিভাগ বন্ধ, নার্সদেরও কাজ নেই

অন্তর্বিভাগ চালু না থাকায় নার্সদেরও কাজ নেই। পাঁচজন নার্সের মধ্যে বৃহস্পতিবার উপস্থিত ছিলেন তিনজন। তাঁদের একজন চন্দনা রানী দত্ত বলেন, ‘অন্তর্বিভাগ থাকলে রোগী ভর্তি, ইনজেকশন দেওয়া—সব কাজ থাকত। এখন শুধু মাঝে মাঝে স্বাস্থ্য শিক্ষা দিই, প্রেশার মাপি।’

নবনিযুক্ত নার্স সাইফুর রহমান বলেন, ‘চাকরিতে ভালো কাজ করার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু এখানে সে সুযোগ নেই।’

হাসপাতালের আবাসিক ভবনগুলো এভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে

আবাসিক ভবনগুলো ‘পরিত্যক্ত’

হাসপাতালের পেছনের অংশে দুটি একতলা ও দুটি দোতলা আবাসিক ভবন রয়েছে। সেগুলোর পরিত্যক্ত অবস্থা। জানালার কাচ ভাঙা, ভেতরে জিনিসপত্রও ভাঙা। ভবনের ভেতরে জন্মেছে গাছ। যেন এক ‘ভুতুড়ে’ পরিস্থিতি।

হাসপাতালটিতে নার্স হিসেবে কর্মরত নুসরাত জাহানের বাড়ি জেলার গৌরীপুরে। চাকরির কারণে এ এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন পরিবার নিয়ে। নার্স নুসরাত জাহান বলেন, কোয়ার্টারগুলো ব্যবহারযোগ্য হলে সেখানে থাকা যেত।

পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালুর দাবি

স্থানীয় শিক্ষক আলী আজগর বলেন, এলাকাবাসী বিনা মূল্যে জমি দিয়ে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ‘অথচ চিকিৎসার অভাবে প্রসূতি নারী রাস্তায় সন্তান প্রসব করে, আহত রোগী পথে মারা যায়। এখন শুধু কিছু ওষুধ দেওয়া হয়, ডাক্তার রোগী দেখে না—এভাবে হাসপাতাল চলে না।’ বলেন তিনি।

গত ৩০ মার্চ ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে হাসপাতাল চালুর অনুরোধ জানিয়েছেন।

যা বলছে কর্তৃপক্ষ

ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন হিসেবে কর্মরত আছেন ফয়সল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালটিতে গাড়িতে যেতে ঘণ্টা দেড়েক সময় লেগে যায়। চরাঞ্চলের মানুষের সেবার জন্য হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা খুবই জরুরি। জনবলকাঠামো অনুমোদনের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে আছে। জনবলকাঠামো অনুমোদন হলে আমরা অন্তর্বিভাগ চালু করতে চাই জরুরি ভিত্তিতে। এতে ধীরে ধীরে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে।’

রোগীদের চাওয়া অনুযায়ী ওষুধ বিতরণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক, নিন্দনীয়। আমি মনে করি এটি একটি অপরাধের মতো ব্যাপার। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।’