বাবা মারা যাওয়ার পর মা অন্যত্র বিয়ে করেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট আলফাজ হোসেন। ২০১২ সালে স্বজনেরা তাঁকে কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবারে (বালক) রেখে আসেন। বর্তমানে তিনি কুষ্টিয়ায় একটি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন। সোমবার তাঁকে সরকারি শিশু পরিবার থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
সোমবার আলফাজসহ পাঁচজনকে ছাড়পত্র দিয়েছে সমাজসেবা কার্যালয়। ১৮ বছর পেরিয়ে গেলে ছেলেদের আর রাখতে পারে না সমাজসেবা কার্যালয়। পাঁচজনের ১৮ বছর অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তাঁরা সবাই শিক্ষার্থী, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান। কিন্তু এ অবস্থায় তাঁরা কোথায় থাকবেন, কীভাবে পড়াশোনা করবেন, সেই চিন্তায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। তাঁরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মানবিক দিক বিবেচনা করে তাঁদের পড়াশোনা ও পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অনুরোধ জানান।
অন্য চারজন হলেন আকাশ শেখ, আকাশ ইসলাম, তুষার আহম্মেদ ও অভি হাসান। সোমবার বিকেলে তাঁরা সবাই স্বজনদের বাড়িতে কোনোরকমে আশ্রয় নিয়েছেন।
সরকারি শিশু পরিবার থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর আলফাজ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি আরও পড়াশোনা করতে চান, থাকার জায়গা চান। নিরুপায় হয়ে তিনি তাঁর বড় ভাইয়ের ঘরে উঠেছেন।
পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান
২০১১ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর দারিদ্র্যের কারণে আকাশ শেখকে তাঁর এক আত্মীয় শিশু পরিবারে রেখে যান। আকাশ বলেন, সেখানে থেকেই তিনি ২০২১ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৪ দশমিক ৮৯ এবং ২০২৩ সালে এইচএসসিতে জিপিএ-৪ পেয়েছেন। বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগে স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ছেন। ২৭ জুলাই তাঁর প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে।
সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে তিনি শিশু পরিবারে আশ্রয় পান। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকে অধ্যয়নরত। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।তুষার আহম্মেদ, শিক্ষার্থী
পরীক্ষার ঠিক আগে আবাসন থেকে ছাড়পত্র দেওয়ায় আকাশ পড়েছেন চরম বিপাকে। পরিবারে মা ও বড় ভাই আছেন। বড় ভাই ভাঙারি ব্যবসা করে কোনোরকমে সংসার চালান। আকাশ তাঁর পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন। তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পশ্চিম লাহিনীপাড়ার মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে আকাশ ইসলাম। এক বছর বয়সে বাবাকে হারান। মা ছেড়ে যাওয়ায় চার বছর বয়সে ২০০৭ সালের অক্টোবর মাসে তাঁর ফুফু তাঁকে কুষ্টিয়া শিশু পরিবারে দিয়ে যান। ২০২১ সালে এসএসসি ও ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করে এখন তিনি কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। ২৭ জুলাই থেকে শুরু হবে প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা। চোখে-মুখে তাঁর এখন চিন্তার ছাপ। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। দাদা মারা গেছেন। দাদি জীবিত, কিন্তু অসুস্থ। তিনি বেশির ভাগ সময় ফুফুর বাড়িতে থাকেন। আকাশও সেখানেই উঠেছেন। তিনি পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করতে চান।
নিরাপদ আশ্রয়ের আকুতি
তুষার আহম্মেদের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে তিনি শিশু পরিবারে আশ্রয় পান। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকে অধ্যয়নরত। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে তিনিও হতাশা প্রকাশ করেন।
নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না বলে জানান অভি হাসান। তিনি বলেন, পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই আশ্রয় হারালে শিক্ষা ও কর্মজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পাঁচজনেরই বয়স ১৮ পেরিয়েছে। কারও বয়স দুই থেকে তিন বছর আগেই ১৮ পেরিয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত তাঁদের লালন-পালনের দায়িত্ব থাকে। তারপরও মানবিক দিক বিবেচনায় তাঁদের রাখা হয়েছিল। সর্বশেষ জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সভা করে তাঁদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। সোমবারই তাঁদের আত্মীয়দের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
ছাড়পত্র পাওয়া পাঁচ শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানান জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক-২ আবদুল্লাহ আল সামী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের থাকা ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা করার আলোচনা চলছে। আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আরও কিছু করা যায় কি না, সে বিষয়েও পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
পাঁচজনের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটু সময় দেন, একটা ব্যবস্থা হবে। তাঁদের কর্মসংস্থানের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে।’