নির্বাচনে আচরণবিধি ভঙ্গের হিড়িক পড়েছে। প্রতীক বরাদ্দের আগেই এখানে-সেখানে চলছে মাইকিং, বিভিন্ন কৌশলে প্রচারণা।

‘সম্মানিত এলাকাবাসী, আসন্ন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থী কাজল ভাইয়ের সালাম নিন। ভোট চাই ভোটারের, দোয়া চাই সকলের। মা–বোনদের বলে যাই, কাজল ভাইয়ের জন্য ভোট চাই। ২৫ মে সারা দিন, কাজল ভাইকে ভোট দিন।’
৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী ওসমান গনি ওরফে কাজলের পক্ষে গত মঙ্গলবার এভাবেই হ্যান্ডমাইক দিয়ে মাইকিং করছিলেন এক ব্যক্তি। তাঁর পেছনে ২০-২৫ জন নারী-পুরুষ লিফলেট বিলি করছিলেন।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আচরণবিধি উপেক্ষা করে অনেকেই এভাবে প্রচারণায় নেমেছেন। প্রতীক বরাদ্দের আগেই এখানে–সেখানে চলছে মাইকিং, বিভিন্ন কৌশলে প্রচারণা। এক্ষেত্রে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
নির্বাচন কমিশন মুখে আইনের কথা বলছে, কিন্তু বাস্তবে দুয়েক জায়গায় প্রয়োগ হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে না। আমি নিজেও অনেককে প্রচার–প্রচারণা করতে দেখেছি।ইফতেখার শিশির, সাধারণ সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগিরক, গাজীপুর শাখা
তবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ফরিদুল ইসলামের দাবি, ৫৭টি ওয়ার্ড তাঁদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি না মেনে প্রচার–প্রচারণা চালালে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৩টি ওয়ার্ড নিয়ে একজন করে মোট ১৯ জন সহায়ক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন।
মহানগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরু না হলেও মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তাঁদের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন। তুলে ধরছেন নানা প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনা। পবিত্র রমজান মাসে ইফতার ও দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে প্রচারণা চালালেও এবার ঈদ-পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন। এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রকাশ্যে কাউন্সিলর প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়া হচ্ছে। চলছে অলিগলিতে মাইকিং, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা।
প্রতীক ছাড়া পোস্টার ছাপিয়ে নানা কৌশলে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। ঠেলাগাড়ি প্রতীকসহ পোস্টার ছাপানো হয়েছে কোনাবাড়ি ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল মান্নানের পক্ষে। আবদুল মান্নান বলেন, ‘ওয়ার্ডে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বী আমরা, দুজনই আলাদা প্রতীক চেয়েছি। প্রতীক নিশ্চিত হওয়ায় প্রতীকসহ পোস্টার প্রেসে দেওয়া আছে। অনেক কর্মী অতি উৎসাহী হয়ে সেগুলো প্রচার করেছেন।’
৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক নেতা ও গাছা থানা যুবলীগের সভাপতি প্রার্থী জুয়েল মণ্ডল। তাঁর স্ত্রী পরিচয়ে এক নারী ফেসবুকে একটি ভিডিও ছেড়েছেন। স্বামীর পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী সাইফুল ইসলাম ওরফে দুলালের ছেলের বিরুদ্ধে প্রচারণায় বাধা দেওয়ারও অভিযোগ তুলেছেন।
ভিডিওতে ওই নারী বলেন, ‘আমি জুয়েল মণ্ডলের স্ত্রী। আমি ভোট চাইতে আসছি। আমার ভোট চাওয়ার অধিকার আছে। সবার কাছে ভোট চাওয়ার অধিকার আছে। আমি একটু আগে ভোট চাইতে গেছি সাইফুল ইসলাম দুলালের ছেলে সাব্বির আমাকে বাধা দিচ্ছিল। আমি যে বাসাতেই যাচ্ছি, সেই বাসাতেই গিয়ে বিরক্ত করছে। আমাকে ভোট চাইতে দিচ্ছে না। আপনাদের জনগণের কাছে প্রশ্ন, আমি কি ভোট চাইতে পারব না। আমাকে কেন বারবার হ্যারাস করা হবে।’ তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাইফুল ইসলাম।
কয়েক দিন নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা গেছে, মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা নানা কৌশলে প্রচার–প্রচারণা চালাচ্ছেন। কেউ কেউ কর্মীসভার নামে এলাকায় ভোট চাইছেন। প্রতিদিনই কোনো না কোনো মহল্লায় প্রার্থীদের কর্মসূচি থাকছে। যেমন গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিকে বাড়ি এলাকার বাশরী রিসোর্টে কাউলতিয়া সাংগঠনিক থানা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে যৌথসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী আজমত উল্লা খান।
এ ছাড়া প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানাভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে কেউ ভোট চাইছেন, কেউ তাঁদের প্রতীকহীন পোস্টারের ছবি দিয়ে তা প্রচার করছেন। যাঁদের প্রতীক নিশ্চিত হয়েছে, তাঁরা প্রতীকসহ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। নানাভাবে প্রার্থীরা প্রচারণা চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি নির্বাচন কর্মকর্তারা।
তফসিল অনুযায়ী ২৫ মে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। এর আগে ৮ মে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন, প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ৯ মে। প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আইন মেনে প্রচার-প্রচারণা শুরু হওয়ার কথা।
সুশাসনের জন্য নাগিরকের (সুজন) গাজীপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন মুখে আইনের কথা বলছে, কিন্তু বাস্তবে দুয়েক জায়গায় প্রয়োগ হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে না। আমি নিজেও অনেককে প্রচার–প্রচারণা করতে দেখেছি। প্রার্থীরা এই সুযোগটা নিচ্ছেন। কারণ, আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না। মনিটরিং ঠিক মতো হচ্ছে না।’