সড়কজুড়ে বড় বড় গর্ত। এর ওপরে জমে আছে পানি। সড়কটিতে বিকল হয়ে পড়া একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ঠেলে গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গত বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে
সড়কজুড়ে বড় বড় গর্ত। এর ওপরে জমে আছে পানি। সড়কটিতে বিকল হয়ে পড়া একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ঠেলে গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গত বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে

‘রাস্তায় না, মনে হইতেছে বিলের মধ্যে গাড়ি ঠেলতেছি’

ভাঙাচোরা সড়কে সতর্কতার সঙ্গেই নিজের সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে এগোচ্ছিলেন চালক হাফিজুর রহমান। একটি স্থানে গোড়ালিসমান পানি দেখে ভেবেছিলেন, কোনোভাবে পার হয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু একটু এগোতেই পানির নিচে লুকিয়ে থাকা একটি বড় গর্তে পড়ে আটকে যায় তাঁর অটোরিকশা। মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায় ইঞ্জিন। শেষ পর্যন্ত পানির মধ্যে বিকল হয়ে যাওয়া গাড়িটি ঠেলে গন্তব্যের দিকে নিয়ে যেতে দেখা যায় তাঁকে।

গত বুধবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের অনন্যা আবাসিক এলাকায় অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে দেখা যায় এ দৃশ্য। ভাঙা সড়ক আর জমে থাকা পানিতে এলাকাটিতে যানবাহন নিয়ে হাফিজুরের মতো একইভাবে বিপাকে পড়েন আরও অনেকে। হাফিজুর রহমান ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, ‘দু-তিন দিন ধরে বৃষ্টি নেই, তারপরও রাস্তা পানির নিচে। কোথায় গর্ত, সেটাও বোঝার উপায় নেই। এ নিয়ে দুবার গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তায় না, মনে হইতেছে বিলের মধ্যে গাড়ি ঠেলতেছি।’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্মাণ করা অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে যান চলাচল শুরু হয় প্রায় এক দশক আগে। সড়কটিতে এখন বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় গর্তগুলো দেখা যায় না। যার কারণে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উদ্বোধনের প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও সড়কটি এখনো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। ফলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও তদারকির অভাবে সড়কটির বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, উঠে গেছে কার্পেটিং। বর্ষায় এসব গর্ত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

২০০৫ সালে নগরের চান্দগাঁও ও কুয়াইশ এলাকার ১৬৯ একর জমির ওপর অনন্যা আবাসিক এলাকার প্রকল্প গ্রহণ করে সিডিএ। প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক। ২০১৩ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। এরপর ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যান চলাচলের জন্য সড়কটি খুলে দেওয়া হয়।

উদ্বোধনের প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও সড়কটি এখনো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। ফলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও তদারকির অভাবে সড়কটির এখন জরাজীর্ণ অবস্থা।

জরাজীর্ণ অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে বিকল হয়ে পড়েছে একটি ট্রাক। গত বুধবার দুপুরে

গত এক দশকে সড়কটির দুই পাশে দ্রুত নগরায়ণ হয়েছে। গড়ে উঠেছে একটি বেসরকারি হাসপাতাল, একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়সহ ১০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অসংখ্য আবাসিক ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। শুধু অনন্যা আবাসিক এলাকার বাসিন্দারাই নন, হাটহাজারী, রাউজান এবং রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার হাজারো মানুষ প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করেন। অথচ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও সড়কটির অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।

সড়কজুড়ে গর্ত, বৃষ্টিতে দুর্ভোগ

কোথাও ছোট–বড় গর্ত, কোথাও উঠে গেছে পিচ—অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের পাঁচ কিলোমিটারজুড়েই এখন এমন দৃশ্য। সবচেয়ে নাজুক অবস্থা বকসুনগর, ওয়াজেদিয়া মোড়, তামান্না বিল্ডিং এলাকা, অনন্যা আবাসিকসহ অন্তত ছয়টি স্থানে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কে প্রায় প্রতিটি যানবাহনই ধীরগতিতে চলাচল করছে। মোটরসাইকেল আরোহীরা পা নামিয়ে ভারসাম্য রেখে এগোচ্ছেন। অটোরিকশা ও রিকশাচালকেরা গর্ত এড়াতে এক পাশ থেকে আরেক পাশে যাচ্ছেন। কেউ কেউ পানির গভীরতা বুঝতে সামনে থাকা গাড়ির পথ অনুসরণ করছেন। মাঝেমধ্যে কোনো গাড়ি গর্তে পড়ে হঠাৎ দুলে উঠছে, আবার কোনোটি বিকল হয়ে থেমে যাচ্ছে। অনন্যা আবাসিক এলাকায় ঢোকার মুখে সড়কের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট এলাকাজুড়ে জমে ছিল গোড়ালিসমান পানি। সেই পানির নিচে কোথায় গর্ত, আর কোথায় সমতল রাস্তা, তা বোঝার কোনো উপায় নেই।

বেহাল অবস্থা চট্টগ্রামের ব্যস্ততম অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের। গত বুধবার তোলা

পথচারী, যাত্রী ও চালকদের অভিযোগ, বৃষ্টি হলেই সড়কটিতে দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। পানির নিচে গর্ত দেখা যায় না বলে প্রায়ই মোটরসাইকেল আরোহীরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যান। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির চাকা, সাসপেনশন ও ইঞ্জিন নষ্ট হচ্ছে। অনেক চালক বাধ্য হয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করেন, আবার অনেকের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

ওয়াজেদিয়া মোড় এলাকার দোকানি মোদাম্মদ লিটন বলেন, সকালবেলা স্কুলগামী শিশু আর অফিসগামী মানুষের সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়। বৃষ্টি হলে বের হওয়ার আগে ভাবতে হয়, আজ আবার কোথায় গাড়ি আটকে যায়। সবচেয়ে ভয় লাগে পানির নিচের গর্ত। কখন যে চাকা পড়ে যাবে, বোঝা যায় না।

দুই সংস্থার টানাপোড়েন

সড়কটি হস্তান্তর নিয়ে সিডিএ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। সিডিএ দুই দফা চিঠি দিয়ে সড়কটির দায়িত্ব দিতে চাইলেও চসিক তা গ্রহণ করেনি। সিটি করপোরেশনের দাবি, কোনো সড়কের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়ার আগে সেটি সম্পূর্ণ ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় বুঝিয়ে দিতে হয়। বর্তমানে সড়কটির যে অবস্থা, তাতে দায়িত্ব গ্রহণ করলে প্রায় নতুন করে নির্মাণের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে।

অনন্যা আবাসিক প্রকল্পে মোট ১ হাজার ৭২৫টি প্লট রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি আবাসন। স্থানীয় মানুষের মতে, এর অন্যতম কারণ নাজুক যাতায়াতব্যবস্থা।

সড়কটি দিয়ে যানবাহন চালাতে গিয়ে প্রায়ই বিপাকে পড়তে হচ্ছে মানুষকে। গত বুধবার তোলা

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, সড়ক হস্তান্তর নিয়ে সমাধানের জন্য দুই সংস্থার পাঁচ সদস্যের একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়। গত জানুয়ারিতে কমিটি তাঁদের সুপারিশ জমা দেয়। এতে বলা হয়, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটি নতুন করে পুনর্নির্মাণ করে হস্তান্তর করতে হবে। আর যদি সিডিএ তা করতে না পারে, তাহলে পুনর্নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থ সিটি করপোরেশনকে দিতে হবে।

জানতে চাইলে সিডিএর চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে চলমান রক্ষণাবেক্ষণকাজ ব্যাহত হয়েছে। কাজ শেষ করেই সড়কটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তিনি বলেন, যে সংস্থাই কাজ করুক, জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের দ্রুত সংস্কার হওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।