রাজশাহী-২ আসনের ভোট গ্রহণের জন্য কেন্দ্রে পৌঁছেছে ব্যালট বাক্সসহ ভোট গ্রহণের সামগ্রী। গভ. ল্যাবরেটরি হাইস্কুল, রাজশাহী
রাজশাহী-২ আসনের ভোট গ্রহণের জন্য কেন্দ্রে পৌঁছেছে ব্যালট বাক্সসহ ভোট গ্রহণের সামগ্রী। গভ. ল্যাবরেটরি হাইস্কুল, রাজশাহী

ভোটের চিত্র

রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনে মোট প্রার্থী ২১২ জন, লড়ছেন ১১ নারী

রাজশাহী বিভাগে আট জেলার ৩৯টি সংসদীয় আসনে মোট ২১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে তিনজন ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে লড়ছেন ১১ প্রার্থী। বিভাগে ২১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন বিএনপির ‘বিদ্রোহী’। সবচেয়ে বেশি সাত আসন বগুড়ায়, সবচেয়ে কম দুটি জয়পুরহাটে। বিভাগে মোট ১১ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা তুমুল প্রচার-প্রচারণায় ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে মাঠে ছিলেন বিএনপির ‘বিদ্রোহী’রাও। বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই নির্বাচনী জনসভায় ভোটারদের বিপুল উপস্থিতি দেখানোর চেষ্টা করেছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে নারীদের মিছিলের আয়োজন করা হয়। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে নারীদের উপস্থিতি বেশি ছিল। বিভাগে ছোটখাটো সহিংস ঘটনা ছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

বিভাগে বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ৫১ বছরের রাজনৈতিক জীবনে এবারই নির্বাচনে মানুষের সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি সারা দেশের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেবার বিভাগের ৩৯টি আসনের মধ্যে ৩৮টি তাঁরা পেয়েছিলেন। এবার সব কটি আসনেই বিএনপি বিপুল ব্যবধানে জয় পাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মিজানুর রহমানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি মানুষের খুবই সাড়া পাচ্ছেন। জয়ের ব্যাপারে তিনি খুবই আশাবাদী। এবার বিভাগে একতরফা কেউ জয় পাবেন না। কয়েকটি আসনে তাঁরা জয়ী হবেন। কয়েকটিতে হয়তো বিএনপি জয়ী হবে। তবে তীব্র লড়াই হবে। জামায়াত বেশিসংখ্যক আসনে জিতবে।

প্রশাসনের প্রস্তুতি

রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। কোনো ধরনের সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা বা নাশকতার চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে।

রাজশাহী বিভাগে ৮টি জেলা, ৬৭টি উপজেলা, একটি সিটি করপোরেশন, ৬২টি পৌরসভা ও ৫৬৫টি ইউনিয়ন। ১৮ হাজার ১৫৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ২ কোটি ৩ লাখ মানুষের বসবাস। ভোটার ১ কোটি ৬৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯৬ জন। ভোটকেন্দ্র ৫ হাজার ২৮৭টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৬৭টি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বিভাগে ২১৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৩৯ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৬৬ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১০ হাজার, বিজিবির ৪ হাজার ১২৩, রেঞ্জ পুলিশের ১৩ হাজার ৭৯৬, আরএমপির ২ হাজার ৪০৫, র‍্যাবের ১ হাজার ৬ ও আনসারের সদস্য ৭২ হাজার ৭৩৬ জন। প্রতি আসনে গড়ে ২ হাজার ৬৬৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। ৫ হাজার ২৬৬টি কেন্দ্রে সিসিটিভি ও ২ হাজার ৩১৮টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জোরদার অভিযান চালানো হয়েছে। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেনাবাহিনী ৫৬টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশ ৭৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৪৩৩টি দেশি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। একই সময়ে বৈধ অস্ত্র জমা পড়েছে ৪ হাজার ৫৯৪টি। নির্বাচনকালীন গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।

৩৬টি আসনে লড়ছে জামায়াত

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নির্বাচনী ঐক্যের কারণে বিভাগের তিনটি আসনে ছাড় দিয়েছে জামায়াত। সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে জোটের হয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আব্দুর রউফ সরকার, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এনসিপির এস এম সাইফ মোস্তাফিজ ও নাটোর-৩ আসনে এনসিপির এস এম জার্জিস কাদির নির্বাচন করছেন। বাকি ৩৬টি আসনে নির্বাচন করছে জামায়াত। জোটের অংশীদার বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির কোনো প্রার্থী নেই।

অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের অংশীদার হয়েও বিভাগের সাতটি আসনে জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোটের মাঠে আছেন এবি পার্টির প্রার্থীরা। এ ছাড়া জোটের আরেক শরিক এলডিপির প্রার্থীর বিরুদ্ধেও প্রচারের মাঠে আছেন তাঁরা।

রাজশাহী-২ আসনে এবি পার্টির প্রার্থী সাঈদ নোমান বলেন, ‘প্রতিটি দলেরই কিছু পলিসি থাকে। দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু প্রত্যাহার করে নিতে বলেনি।’ এদিকে তাঁকে ওসমান হাদির মতো প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন তিনি।

এদিকে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি সূত্র জানায়, গত ২৬ জানুয়ারি রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানার চণ্ডীপুর এলাকার বাসিন্দা মো. রোকন উদ্দিন একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে বলা হয়, এবি পার্টির প্রার্থী মু. সাঈদ নোমান নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করেছেন। এ অভিযোগকে ‘নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম’ হিসেবে গণ্য করে কমিটি তা নথিভুক্ত করে। পরে অভিযোগকারীকে ডাকা হলে তিনি ১ ফেব্রুয়ারি কমিটির সামনে হাজির হয়ে জবানবন্দি দেন এবং প্রমাণ হিসেবে একটি পেনড্রাইভে ভিডিও ফুটেজ জমা দেন।

এগুলো পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে মত দেয় কমিটি। এরপর মু. সাঈদ নোমানের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। বিষয়টি ‘নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম’ হিসেবে আমলে নিয়ে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার (সামারি ট্রায়াল) করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
১১ নারী প্রার্থী

রাজশাহী বিভাগে বিএনপির একজন, দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও অন্যান্য দলের মোট ১১ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের মোছা. হাবিবা বেগম আলোচিত একজন প্রার্থী। হাইকোর্ট থেকে আইনি লড়াই করে ছয় দিন পরে প্রতীক পেয়েছেন। এর আগে মোহনপুর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। হাবিবা বেগম বলেন, প্রচারে পিছিয়ে পড়েছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁর নামে ছয়টি মামলা হয়। তাঁকে সাতবার কারাগারে যেতে হয়েছে। এখনো দুটি মামলা আছেন। তিনি উপজেলা কৃষক লীগের সাবেক নারীবিষয়ক সম্পাদক। তিনি একাই নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। তাঁর দাবি, তাঁর সমর্থকেরা প্রচারণায় বের হলেই তাঁদের আওয়ামী লীগ ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য তিনি একাই প্রচারের মাঠে কাজ করেছেন।

অন্য নারী প্রার্থীরা হলেন নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের প্রয়াত নেতা ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে ফারজানা শারমীন পুতুল, নাটোর-২ (সদর-নলডাঙ্গা) আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাহমিদা ইয়াসমিন তানিয়া, নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আরফানা বেগম, বগুড়া-৬ (সদর) আসনের বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী দিলরুবা, জয়পুরহাট-১ (সদর-পাঁচবিবি) আসনের বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) প্রার্থী তৌফিকা দেওয়ান, একই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের অর্থ সম্পাদক সাবেকুন নাহার, সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর-সদর একাংশ) আসনের গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মল্লিকা খাতুন, সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রার্থী ইলোরা খাতুন, পাবনা-৩ (চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর) আসনের গণফোরামের প্রার্থী সরদার আশা পারভেজ ও পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) আসনের নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী শাহানাজ হক।

ভোটে থেকেও নেই যাঁরা

বিএনপি, জামায়াত ও বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের বাইরে অনেকেই নামেই প্রার্থী হিসেবে ছিলেন। এর মধ্যে নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে দলের প্রয়াত নেতা ফজলুর রহমান পটলের ছেলে মোহাম্মদ ইয়াসির আরশাদ তাঁর বোন ফারজানা শারমিন পুতুলকে সমর্থন করে মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও প্রেসিডিয়াম সদস্য খান কুদরত-ই-সাকলায়েন মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য প্রস্তাবকের মাধ্যমে আবেদন করেছিলেন। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তাও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর এই আবেদন কার্যকর হয়নি। পরে তিনি ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।