
যশোরের মনিরামপুর উপজেলা পরিষদের সামনে একটি চায়ের দোকান। গতকাল শনিবার বেলা ২টা ১০ মিনিট। সেখানে বসে আছেন জনা দশেক লোক। তাঁদের মধ্যে চারজন চা পান করছেন। পাশে বসে কথা বলেছিলেন আরও ছয়জন। তাঁরা চা পান শেষ করেছেন। তাঁরা কথা বলছেন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে।
একজন বললেন, যত দিন যাচ্ছে, কলস মার্কার অবস্থা ভালো হচ্ছে। আরেকজন বললেন, কলস ও ধানের শীষের টানাটানিতে দাঁড়িপাল্লা বেরিয়ে যেতে পারে। পাশে বসা একজন সামনের টুলের ওপর রাখা মুঠোফোন তুলে নিলেন। একজনকে কল করে জানতে চাইলেন, আওয়ামী লীগের ওই নেতা কার পক্ষে কাজ করছেন?
সামনে বসা ধোঁয়া তোলা চায়ের গরম কাপে চুমুক দিতে দিতে উপজেলার বিজয়রামপুর গ্রামের রংমিস্ত্রি নওশের আলী (৫৮) বললেন, মনিরামপুরে ধানের শীষ জিতবে। তবে কলস ও ধানের শীষের মধ্যে ভোট কাটাকাটি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দাঁড়িপাল্লা এগিয়ে যেতে পারে।
চায়ের দোকানের সামনে ভ্যানের ওপর বসে ছিলেন উপজেলার ফেদাইপুর প্রামের ডিম বিক্রেতা হোসেন আলী (৫০)। তিনি বলেন, ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রশীদ আহমাদ নতুন মুখ। তাঁর বাবা মুফতি ওয়াক্কাসকে সবাই চিনতেন। কিন্তু রশীদ আহমাদকে মানুষ খুব একটা চেনেন না। ভোটের লড়াই হবে স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ মো. ইকবাল হোসেন ও জামায়াতের গাজী এনামুল হকের মধ্যে। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও বিএনপি নেতা ইকবালকে দলের অনেকে ভোট দেবেন। সব মিলিয়ে জামায়াত সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।
প্রচার-প্রচারণায় মুখর যশোর-৫ আসন। চলছে মাইকিং। মোড়ে মোড়ে টানানো হয়েছে প্রার্থীদের ব্যানার। পথসভা, এলাকায় এলাকায় গিয়ে প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের চলছে ভোট প্রার্থনা। সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও চলছে ভোটের আলোচনা। চলছে বিশ্লেষণ। কোন প্রার্থীর কোথায় কী অবস্থান, হিন্দুদের ভোট কে পাবেন, কে জিততে পারেন—এসব নিয়ে আলোচনা সর্বত্র।
মনিরামপুর উপজেলা নিয়ে যশোর-৫ আসন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে মোট ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রশীদ আহমাদ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গাজী এনামুল হক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে। হাতপাখার প্রার্থী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জয়নাল আবেদীন। জাতীয় পার্টি এম এ হালিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন লাঙ্গল প্রতীকে। স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ মো. ইকবাল হোসেন কলস প্রতীক নিয়ে এবং মো. কামরুজ্জামান ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
শহীদ মো. ইকবাল হোসেন মনিরামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। বিএনপি তাঁকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছিল। পরে তা পরিবর্তন করে বিএনপির শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রশীদ আহমদকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামেন শহীদ মো. ইকবাল হোসেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়।
শহীদ মো. ইকবাল হোসেন ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন। দুইবারই তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রয়াত খান টিপু সুলতানের কাছে হেরে যান। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে দল তাঁকে মনোনয়ন দিয়ে পরে তা পরিবর্তন করে জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতি ওয়াক্কাসকে দেয়।
হরিদাসকাটি ইউনিয়নের মোট ভোটারের অর্ধেকের বেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের। পাঁচকাটিয়া, নেবুগাতী, কুচলিয়া, কুমারসীমা, ভুলবাড়িয়া, দিগঙ্গা গ্রামের জনসংখ্যার সবাই হিন্দু এবং ইউনিয়নের অবশিষ্ট ১২টি গ্রামের জনসংখ্যার অধিকাংশই হিন্দু বলে জানান নেবুগাতী গ্রামের মিলন মণ্ডল (৩৩)। তিনি বলেন, ভোটের পরিবেশ ভালো। সবাই প্রচারণা করছেন। মাইকিং চলছে। লিফলেট নিয়ে গ্রামে গ্রামে আসছেন নেতা–কর্মীরা। তবে ভোটের যে উত্তাপ, সেটা দেখা যাচ্ছে না।
এই আসনে মোট ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রশীদ আহমাদ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গাজী এনামুল হক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে।
শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটা। তিনটি গ্রামের অন্তত সাতজন নারী ও পাঁচজন পুরুষ ভোটারের সঙ্গে কথা হয় উপজেলার হাজিরহাট বাজারে। হিন্দু ভোটারদের ভাষ্য, যাঁরা তাঁদের পাশে থাকবে, তাঁদের নিরাপত্তা দেবে, তাঁরা তাঁদের ভোট দেবেন। তাঁরা যেন নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার না হন, প্রার্থী ও তাঁর দলের কাছে সেই নিশ্চয়তা ও প্রতিশ্রুতি চান। তা না হলে এলাকার ভোটাররা বিশেষ করে নারী ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন না।
প্রচারে ভালো সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়ে শহীদ মো. ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ইনশা আল্লাহ আমি জয়লাভ করব। মনিরামপুরে ৭০ হাজারেরও বেশি হিন্দু ভোটার আছেন। তাঁদের বেশির ভাগ আমাকে ভোট দেবেন। কিন্তু আমাদের কাছে দু-একটি খবর আছে, কে বা কারা হিন্দু এলাকায় গিয়ে হিন্দুদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করছে। যদি তাঁরা যান, তবে বিশেষ একটি প্রতীকে ভোট দিতে বলছে। বিষয়টি আমরা নির্বাচন কমিশনে জানিয়েছি।’
রশিদ আহমাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোটারদের অনেক সাড়া পাচ্ছি। আমার বাবা এই আসন থেকে তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি অত্যন্ত সততার সঙ্গে চলেছেন। আব্বার ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে ভোটারদের অনেক বেশি সাড়া পাচ্ছি। ইনশা আল্লাহ অবশ্যই জয়লাভ করব।’
একাধিকবার চেষ্টা করেও গাজী এনামুল হকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮২। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ২১৫ জন, মহিলা ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৩ জন এবং হিজড়া ভোটার ৪ জন।