
‘আমার একটা মেয়ে। ২২ বছর বয়স হয়েছিল। আমি মাইনে নিতে পারতেছি না। গত শুক্রবার তাঁর জন্মদিন পালন করছি। আত্মীয়স্বজন সবাইরে দাওয়াত দিছি। আমার ঝি কত খুশি। এখন শেষ, সব শেষ।’
কথাগুলো বলতে বলতে চোখ ভিজে আসে দিদারুল আলমের। গত শুক্রবারও যে মেয়ের জন্মদিন ঘিরে বাড়িতে আনন্দ ছিল, আজ মঙ্গলবার সেই মেয়ের মরদেহের সামনে দাঁড়াতে হলো তাঁকে। তাঁর মেয়ে মাইশা মুশফিরাত আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। আজ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে লরির ধাক্কায় উল্টে যাওয়া একটি মিনিবাসের নিচে চাপা পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নে এ দুর্ঘটনায় আরও এক ছাত্রীসহ তিনজন আহত হয়েছেন। মাইশার মরদেহ মিরসরাই উপজেলার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে৷
তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে দিদারুল আলমের সংসার। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘আমার তিন ছেলে। এক মেয়ে। এখন মেয়েটা নাই।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দিদারুল আলম সাংবাদিকদের জানান, সকালে মাইশা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। পরে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে ছুটে আসেন। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ একটা কনটেইনারবাহী লরি ধাক্কা দেয় বাসটিকে। আর বাসটি গিয়ে পড়ে আমার মেয়ের ওপর। এরপর আমি খবর পাই। হাসপাতালে এসে দেখি মেয়ে আর নাই।’
হাসপাতালে এসেছিলেন মাইশার মা সালমা আক্তারও। মেয়েকে হারিয়ে বিলাপ করছিলেন তিনি। আঞ্চলিক ভাষায় বলছিলেন, ‘আঁর ঝিরে আনি দে। আঁর ঝিরে আঁই শোকেশে রাখমুতো।’
কোনো রকমে নিজেকে সামলে সালমা আক্তার জানান, সকালে মেয়ের সঙ্গে তাঁর দুই মিনিট কথা হয়েছিল। মাইশার মাথাব্যথা ছিল। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তাঁকে ফোন করে বলেন, ‘আপনার মেয়ে অ্যাকসিডেন্ট করছে। হাসপাতালে আসেন।’
মেয়ের পড়ালেখা ও ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা মনে করছিলেন সালমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের স্বপ্ন ছিল চাকরি করবে। বড় হবে পড়ালেখা করে। পড়ালেখায় ভালো ছিল।’ মাইশার মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভও প্রকাশ করেন তাঁর বাবা। মহাসড়কে কনটেইনারবাহী লরির বেপরোয়া চলাচল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। বলেন, ‘দিনের বেলা বেপরোয়াভাবে কনটেইনারবাহী লরিগুলো ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলতেছে। এগুলা কি আমাদের দেশের এমপি-মন্ত্রীরা দেখতেছে না। শত শত মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হইছে। মানুষ মইরতেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো মূল্যায়নই নাই।’ দিদারুল বলেন, ‘আপনারা দোয়া করবেন, আর কারও বুক যেন খালি না হয় আমার মতো।’
দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দুটি লরি পরস্পর প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছিল। এ সময় একটি লরি থেমে থাকা মিনিবাসকে ধাক্কা দেয়। এতে মিনিবাসটি কাত হয়ে উল্টে পড়ে।
বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার সার্জেন্ট শফিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক এলাকায় মিনিবাস থেকে মাইশা নামেন। এর একটু পর মিনিবাসটি তাঁর ওপর উল্টে পড়ে। একই ঘটনায় আরও তিনজন আহত হন। স্থানীয় লোকজন লরি দুটি আটক করেন। পরে পুলিশ লরি দুটি ও মিনিবাস থানায় নিয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোস্তফা মুনির চৌধুরী জানান, আহত অপর শিক্ষার্থী গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
সহপাঠীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। তাঁরা দুর্ঘটনার প্রতিবাদ জানান এবং পদচারী-সেতু নির্মাণের দাবি তোলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র শাহ নেওয়াজ চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনার আশঙ্কায় তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে পদচারী-সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন।
অবরোধে মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার যানজট হয়। সীতাকুণ্ড ও ফৌজদারহাট স্টেশনে আটকা পড়ে যথাক্রমে মহানগর প্রভাতী ও মহানগর এক্সপ্রেস। চট্টগ্রাম থেকে মহানগর গোধূলী ছাড়তেও বিলম্ব হয়। বাস ও ট্রেনের যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম ঘটনাস্থলে গিয়ে দাবি পর্যায়ক্রমে মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন। এরপর বিকেল সোয়া চারটার দিকে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর মহাসড়ক ও রেলপথে চলাচল শুরু হয়।