খেতের আধা পাকা টমেটো হাতে ধরে আছেন মো. হারুন। বুধবার দুপুরে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার উপাদী গ্রামে
খেতের আধা পাকা টমেটো হাতে ধরে আছেন মো. হারুন। বুধবার দুপুরে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার উপাদী গ্রামে

বিষমুক্ত টমেটো চাষে এক মৌসুমেই হারুনের আয় ছয় লাখ টাকা

মো. হারুনের পৈতৃক জমি ছিল না। সংসার চলত দিনমজুরি করে। দিন কাটত অর্ধাহার–অনাহারে। তিনি ২০১০ সালে কিছু জমি বর্গা নিয়ে শুরু করেন টমেটোর আবাদ। আগাম টমেটো বিক্রি করে ওই বছর আয় করেন দেড় লাখ টাকা।

এর পর থেকে মো. হারুন প্রতিবছর শীত মৌসুমে ৬০–৮০ শতাংশ জমিতে আগাম টমেটো চাষ করেন। বিষমুক্ত হওয়ায় তাঁর টমেটোর চাহিদা বেশি। প্রতি মৌসুমে গড়ে তাঁর আয় হয় প্রায় ছয় লাখ টাকা। লাভের টাকায় তিনি বানিয়েছেন পাকা বাড়ি; কিনেছেন ৫০ শতাংশ জমি। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের খরচও চলছে টমেটো বিক্রির টাকায়। বিষমুক্ত আগাম টমেটোতে হারুনের সচ্ছলতা ও দিন বদলের গল্প স্থানীয়দের মুখে মুখে। এলাকায় তিনি ‘টমেটো হারুন’ নামেও পরিচিত। তাঁর দেখাদেখি এলাকার আরও ৩০-৩২ জন কৃষক আগাম টমেটো চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

খেতের পরিচর্যা করছেন মো. হারুন

মো. হারুনের (৫৫) বাড়ি চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার উপাদী গ্রামে। চার ভাইয়ের মধ্যে হারুন সবার বড়। বাবা-মা, তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে তাঁর পরিবার। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে উপাদী গ্রাম। গ্রামের সরকারি খালের পাড়ে হারুনের একতলা ছিমছাম বাড়ি। বাড়ির পাশে বিস্তীর্ণ বিল। বুধবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, খেতে টমেটোর পরিচর্যা করছেন হারুন। তুলছেন আধা পাকা ও পাকা টমেটো। কাজের ফাঁকে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

মো. হারুন বলেন, সংসারে অভাবের যন্ত্রণা তাঁকে ভীষণ কষ্ট দিত। বিকল্প কিছু করার কথা ভাবেন। ২০১০ সালে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৩০ শতাংশ জমি বর্গা নিয়ে শীত আসার আগে টমেটো চাষ করেন। ফলন ভালো হয়। টমেটো বিক্রি করে প্রথমবার আয় করেন দেড় লাখ টাকা। এর পর থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে প্রাক্‌-শীত মৌসুমে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ জমিতে বিষমুক্ত টমেটো চাষ করছেন। উৎপাদন খরচ মিটিয়ে বছরের প্রাক্‌-শীত মৌসুমেই গড়ে আয় করেন প্রায় ছয় লাখ টাকা। টমেটো বিক্রির টাকায় সংসারের খরচ চলছে। ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে বানিয়েছেন একতলা পাকা বাড়ি। কিনেছেন ৫০ শতাংশ জমি। দুই মেয়ের বিয়ের খরচ মিটিয়েছেন। এক মেয়ে ও এক ছেলের লেখাপড়া ও যাবতীয় খরচও চলছে তাঁর আয়ে।

হারুন জানান, এবার ৬০ শতাংশ জমিতে টমেটো চাষ করেছেন। এতে খরচ হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ফলন হবে ৩০০ মণ। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে কিছু টমেটো বিক্রি করেছেন। বাকিগুলো ফেব্রুয়ারির আগেই বিক্রি হবে। টমেটো বিক্রিতে এবার পাবেন প্রায় ৭ লাখ টাকা। তিনি বলেন, ‘টমেটো চাষ কইরা সচ্ছল অইছি এটাই বড় কথা। অভাবকে লাল কার্ড দেখাইছি। আমার দেহাদেহি গ্রামের আরও অনেকেই টমেটো চাষ কইরা আয় করতাছে। আরও বেশি জমিতে আগাম টমেটো চাষ করার ইচ্ছা আছে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চৈতন্য পাল বলেন, অভাবের সঙ্গে লড়াই করে হারুন যেভাবে টমেটো চাষ করে সচ্ছল ও স্বাবলম্বী হয়েছেন, তা দৃষ্টান্ত। হারুনসহ ওই এলাকার টমেটোচাষিদের নানাভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।