হাসপাতালে শুয়ে বাঘের মুখ থেকে বেঁচে ফেরার গল্প বলছিলেন বাবলু গাজী। গতকাল রোববার
হাসপাতালে শুয়ে বাঘের মুখ থেকে বেঁচে ফেরার গল্প বলছিলেন বাবলু গাজী। গতকাল রোববার

হাসপাতালে শুয়ে বাঘের মুখ থেকে বেঁচে ফেরার গল্প শোনালেন বাবলু গাজী

সুন্দরবনের গভীরে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের মুখোমুখি হয়েছিলেন মৌয়াল বাবলু গাজী (৪৮)। জীবন-মৃত্যুর সেই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বাঘকে প্রতিহত করে ফিরেছেন তিনি। তবে বাঘের থাবায় তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, ভেঙে গেছে ডান হাতের বাহুর হাড়। এখন তিনি সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যায় সুস্থ হওয়ার লড়াই করছেন।

১০ মে সকাল আটটার দিকে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের কাছিকাটা এলাকার পায়রাটুনি খালে এ ঘটনা ঘটে। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর সঙ্গীরা তাঁকে লোকালয়ে নিয়ে আসেন। বাবলু গাজী সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামের মালেক গাজীর ছেলে।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে রোববার সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন বাবলু গাজী। তিনি বলেন, ‘৬ মে বুড়িগোয়ালিনী অফিস থ্যাকে পাস নে আমরা ১০ জন জঙ্গলে গেলাম মৌ কাটতি। দুই ভাগে ভাগ হুয়ে পাঁচজন কুরে দুই খালের দুই বাড়দে কাটতি কাটতি যেতিলাম। খালের আগায় একটা বড় চাক পেলাম। আদা মণটন মৌ ছেলো। আমি টেকের ওপর দাঁড়াইছি, এর মদ্যি ডান দিকদে বাঘ লাফ দে পুড়ে। পুড়ার পর আমারে ফেলে দে।’

বাবলু গাজী বলেন, ‘আমাগে আর চারজন লোক কুড়ি-বাইশ হাত সামনে দাঁড়ায়ে রয়ে। বাঘ আমারে ঠাসতে আর আও আও শব্দ করতে। ওই সময় বাঘের মাথায় ছেলো জট। আমার বাম হাতে ড্রামের দড়ি ছেলো। দড়ি দে জটে পেঁচাই দিলাম। পরে ড্রামটা আমার বাম কাদ থ্যাকি ফ্যালে দিলি বাঘের পার উপর য্যায়ে পুড়েছে। হিংস্র বাঘ ড্রামে লাথি মারতি শুরু করল। এক লাথিতে সরেনি। পরে আরেক লাথি দিলে মাথার জট ছিড়ে গেবরুয়েছে। তারপর আমারে কামড় আর আচড়ে দে সামনে চলে গে।’

বাঘ চলে যাওয়ার পরও জীবনযুদ্ধ থামেনি বাবলু গাজীর। গুরুতর আহত অবস্থায় কোনোরকমে হামাগুড়ি দিয়ে সঙ্গীদের কাছে পৌঁছান তিনি। বাবলু বলেন, ‘নিজের গামছা দে নিজেই ঘা ব্যান্ডেস কুরেছি। তারপর একজনের খাড়ে হাত দে হাঁটতি হাঁটতি নৌকায় আইছি। জঙ্গলের মধ্যি আমারে পরিষ্কার কুরে ক্ষত জায়গায় চিনি দে। পরে ডাক–চিৎকারে আর পাঁচজন চলে এয়ে। তাদের কলাম বাড়ি নে চল। তারা সারা রাত নৌকো বেয়ে বাড়ির নে অ্যাসে পরের দিন হাসপাতাল ভর্তি কুরেছে।’

১৩–১৪ বছর বয়স থেকে বাবা মালেক গাজীর হাত ধরে সুন্দরবনে যাওয়া শুরু বাবলুর। মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহই তাঁর জীবিকা। তিনি বলেন, ‘বাবা শিখাইছিল বাঘের হাত থ্যাকে কেমনে বাঁচতি হয়। কিন্তু ওই সময় কোনো অভিজ্ঞতাই কাজে আসল না।’
সংসারে মা–বাবা, স্ত্রী, তিন সন্তানসহ সাত সদস্য। সামান্য ৮–১০ কাঠা জমি ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই। তিন সন্তানই পড়াশোনা করে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবলুই। তাঁর স্ত্রী কুলসুম খাতুন বলেন, এখন সংসার কেমন করে চলবে, বুঝতে পারছেন না তিনি। চিকিৎসার খরচও অনেক। তিনি তাঁর স্বামীর জন্য সবার কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন।

ছেলে মোস্তাকিম গাজী বলে, ‘বৈধভাবে সুন্দরবনে গে কেউ বন্য প্রাণীর আক্রমণের শিকার হলে সরকারি সহযোগিতা পাওয়ার কুথা। কিন্তু এখনো কেউ আমাগে খোঁজ নেয়নি। আমরা সহযোগিতা চাই।’

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিকস সার্জন বি কে মণ্ডল বলেন, বাবলু গাজীকে প্রথমে সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁর জীবনের ঝুঁকি কমে। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, তাঁর ডান হাতের বাহুর হাড় ভেঙে গেছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাড় ও ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু ঠিক করা হয়েছে। তবে এ ধরনের রোগীর সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। বর্তমানে তিনি আগের চেয়ে ভালো আছেন।

বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, বাঘের আক্রমণে আহত ওই মৌয়ালের বিষয়ে তাঁরা খোঁজখবর রাখছেন। সরকারি সহায়তা পাওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে থানায় সাধারণ ডায়েরি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে বলা হয়েছে।