
দিন শেষে শুধু একটি ক্রেস্ট বা সম্মাননাই নয়, সঙ্গে করে সবাই নিয়ে গেলাম নতুন করে পথচলার সাহস, আরও বড় হওয়ার প্রত্যয়। এটি একটি অঙ্গীকার—ভালো ফলের পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হতে হবে। শিখো-প্রথম আলো জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনায় এসে কথাগুলো বলল গাজীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া ইমরান মাহমুদ।
আর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আসতে খুব ভোরে উঠতে হয়েছে চরফ্যাশন ওসমানগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া আছিয়া জাহানের। বাড়ি থেকে অটোরিকশায় করে ১৫ কিলোমিটার দূরে চরফ্যাশন শহরে এসে ভোরের প্রথম বাস ধরতে হয়েছে। এরপর ভোলা জেলা শহরে এসে আবার অটোরিকশায় করে অনুষ্ঠানস্থলে। তার সঙ্গে তাঁর বাবাও কষ্ট করেছেন। কিন্তু অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আনন্দে সব কষ্ট ভুলে যাওয়ার কথা জানাল আছিয়া।
প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।
আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
সংবর্ধনার ভোলা পর্ব আজ শনিবার আয়োজন করা হয় জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে। ঘড়ির কাঁটা সকাল আটটা ছুঁতেই মিলনায়তনের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে। জেলার সাত উপজেলা থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা আসতে থাকে। কারও সঙ্গে বাবা, কারও সঙ্গে মা; আবার কেউ এসেছে পুরো পরিবার নিয়ে।
সংবর্ধনা নিতে এসে উচ্ছ্বসিত দৌলতখান থেকে আসা শিক্ষার্থী মো. আসাদুজ্জামান। তার ভাষায়, এই সম্মান সবার জন্য নয়; যারা পরিশ্রম করেছে এবং লক্ষ্য ধরে রেখেছে, তাদের জন্যই এমন স্বীকৃতি। বন্ধুদের সঙ্গে এই আনন্দ ভাগাভাগি করতে পেরে সে খুব খুশি।
শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, আনন্দ ছুঁয়ে যায় অভিভাবকদের মনেও। সাগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুরাইয়া বেগম নিজের সন্তানকে নিয়ে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। তিনি বলেন, এমন আয়োজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—উভয়ের জন্যই অনুপ্রেরণার। প্রতিবছর এ ধরনের সংবর্ধনা হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার আগ্রহ আরও বাড়বে।
ছেলে মাহাদী হাসানকে নিয়ে সুদূর চরফ্যাশন থেকে এসেছেন আরেক অভিভাবক নজরুল ইসলাম। তিনি বললেন, সবচেয়ে ভালো লেগেছে জেলার সব উপজেলার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এক জায়গায় দেখতে পেয়ে। এতে বোঝা যায়, ভোলার ছেলেমেয়েরা কত ভালো ফলাফল করছে। ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত থাকুক, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা।
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। স্বাগত বক্তব্য দেন ভোলা প্রতিনিধি মো. নেয়ামতউল্যাহ।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ভোলা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, জিপিএ-৫ কোনো গন্তব্য নয়। এটি কেবল নতুন পথচলার শুরু। সামনে আরও বড় পরীক্ষা, আরও বড় দায়িত্ব অপেক্ষা করছে। তাই শুধু ভালো ফল করলেই হবে না, একজন সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবেও নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।
ভোলা সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, বর্তমান সময়ে সমাজে অনেক অমানবিক ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনায় মানুষকে বাঁচানোর বদলে অনেকেই ভিডিও ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নতুন প্রজন্মকে সেই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
ভোলা সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. এরশাদ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, এই সাফল্যের পেছনে শুধু শিক্ষার্থীর নয়, মা–বাবা, শিক্ষক ও সমাজেরও অবদান রয়েছে। তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, সামনে এইচএসসি, উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। এখন থেকেই সেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
সমাপনী বক্তব্য দেন প্রথম আলোর বরিশালের নিজস্ব প্রতিবেদক এম জসিম উদ্দিন। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী বৈশাখী, তিথিরানী, মুবাশশিরা রহমান, ফারিয়া আক্তার, লামিয়া আক্তার কবিতা আবৃত্তি করে এবং গান পরিবেশন করে।
সংগীত পরিবেশনের সময় বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের সংগীতশিল্পী মনির চৌধুরী স্মার্টফোন ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তি প্রয়োজনীয় হলেও এর অপব্যবহার যেন শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়।