
পাবনার বেড়া পৌর এলাকার একটি ছোট্ট সেলুন। সেখানে নিয়মিত বসেন ৭২ বছর বয়সী শংকর শীল। সামনে প্রশস্ত আয়না, পাশে রাখা কাঁচি আর ক্ষুর। শরীরে বয়সের ছাপ স্পষ্ট, তবু কাজ থামাননি।
প্রায় ৬২ বছর ধরে নরসুন্দরের কাজ করছেন শংকর শীল। বর্তমানে যে কাজের জন্য পান প্রায় ১০০ টাকা, একসময় এর মজুরি ছিল ১৫ পয়সা। দাড়ি শেভ করতে ৫ পয়সা আর চুল কাটায় বাকি ১০ পয়সা।
স্মৃতি হাতড়ে শংকর শীল জানান, বড় হয়েছেন অভাবের সংসারে, চার ভাই ও তিন বোনের পরিবার তাঁদের। টানাপোড়েনে ছোট থেকেই কাজে নামতে হয় তাঁকে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১০ বছর। পড়তেন চতুর্থ শ্রেণিতে। বাবার হাত ধরেই শুরু হয় এই কাজ। এরপর আর পড়াশোনা এগোয়নি।
শংকর শীলের বাবাও ছিলেন নরসুন্দর। প্রথমে ফুটপাতে টুল বসিয়ে বাবার সঙ্গে চুল-দাড়ি কাটতেন। অনেক সময় গ্রামে গ্রামেও ঘুরতে হতো। বাড়ি বাড়ি গিয়েও কাজ করেছেন। তখন গ্রামে সেলুন ছিল না বললেই চলে।
শংকর শীল বলেন, ছোটবেলায় বাবার পাশে বসেই কাজ শিখেছেন। ধীরে ধীরে নিজেই গ্রাহকদের চুল-দাড়ি কাটতে শুরু করেন।
সময় বদলেছে, বদলেছে কাজের ধরনও। ১৫ থেকে ২০ বছর আগে ফুটপাত ছেড়ে ছোট একটি সেলুন নেন শংকর শীল। ভাড়া কম, মানেও সাধারণ। তবু আশপাশের মানুষ নিয়মিত তাঁর সেলুনে আসেন। বয়সের সঙ্গে শারীরিক সমস্যাও এসেছে তাঁর। কয়েক বছর আগে চোখে ছানি পড়ে। তিন মাস আগে অপারেশন করান। এখন চশমা পরে কাজ করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে পরিবারের দায়িত্বও সামলেছেন শংকর। নিজের উপার্জনে তিন বোন ও তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। অসুস্থ বাবা-মায়ের দেখাশোনাও করেছেন। এখন স্ত্রী, একমাত্র ছেলে, ছেলের বউ ও নাতনিকে নিয়ে সংসার। তাঁর ছেলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সাধন কুমার বলেন, ছোটবেলা থেকেই শংকর শীলকে দেখে আসছেন। তাঁর জন্মের পর মাথা ন্যাড়া করানোর কাজও শংকরই করেছিলেন বলে শুনেছেন। এখনো মাঝেমধ্যে তাঁর কাছেই চুল কাটান।
আরেক বাসিন্দা রতন কুমার বলেন, ছোটবেলায় ফুটপাতে বসে তাঁর কাছে চুল কাটার স্মৃতি আছে। এখন সেলুনে বসেন। বয়স হলেও কাজের দক্ষতা কমেনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সেলুনটি আধুনিক নয়। কিন্তু শংকর শীলের অভিজ্ঞতা আছে, ধৈর্য আছে। সে জন্য অনেকেই এখনো তাঁর কাছে যান। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু শংকর শীলের হাতে ধরা কাঁচি আর ক্ষুর বদলায়নি।