জন্ম থেকেই শরিফ আলীর (১৯) দুই চোখে আলো নেই। অনেক বাধা পেরিয়ে তিনি পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন। দুই–এক বছর নষ্ট হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। সামনে তাঁর এসএসসি পরীক্ষা; পুরোদমে তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি কোনো শ্রুতলেখক খুঁজে পাননি। এতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
শরিফ ঠাকুরগাঁও পৌরসভার গোবিন্দনগর মুনশিরহাট এলাকার ইজিবাইকচালক রমজান আলীর ছেলে। দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও ছেলেকে লেখাপড়া শেখানোর প্রবল ইচ্ছা ছিল পরিবারের। ছোটবেলা থেকেই শরিফের পরিবার মুখে মুখে পড়া শেখাত এবং শরিফও তা দ্রুত আয়ত্ত করেছেন। পরে তাঁকে বাড়ির পাশে গোবিন্দনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ২০২১ সালে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এবার সেখান থেকেই এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা তাঁর। ২১ এপ্রিল পরীক্ষা শুরু হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নিতে একজন শ্রুতলেখকের সাহায্য প্রয়োজন। ‘পাবলিক ও শ্রেণি পরীক্ষায় শ্রুতলেখক সেবা গ্রহণসংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার পরপরই শ্রুতলেখকের জন্য আবেদন করতে হয়। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শ্রুতলেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে। পরীক্ষার্থী নিজেও শ্রুতলেখক মনোনয়ন দিতে পারে; না হলে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব থাকে ব্যবস্থা করার।
তবে নানা চেষ্টা করেও এখনো কোনো শ্রুতলেখক পাননি শরিফ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একজন শ্রুতলেখকের জন্য পোস্ট দিয়েছেন তিনি। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘আমি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। স্বপ্ন আছে, ইচ্ছা আছে—কিন্তু নিজের হাতে লিখে পরীক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা নেই। তাই আমার জন্য একজন রাইটার (শ্রুতলেখক) প্রয়োজন। তবে কি শুধুমাত্র একজন রাইটার না পাওয়ার কারণে আমার এসএসসি পরীক্ষার স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাবে? কেউ কি আছেন, মানবিকতার জায়গা থেকে আমার পাশে দাঁড়াবেন? আপনাদের মতো আমারও ইচ্ছা—পড়াশোনা করে দেশের জন্য কিছু করা। আপনাদের সামান্য সহযোগিতাই আমার জীবনের বড় স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।’
শরিফ বলেন, ‘আমার দৃষ্টি ফেরাতে মা-বাবা অনেক চেষ্টা করেছেন। লেখাপড়া করে চাকরি পেলে তাঁদের ঋণ কিছুটা শোধ করতে পারব। কিন্তু এখন পরীক্ষায় অংশ নিতে পারব কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
শরিফের মা সফুরা বেগমও ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ‘দৃষ্টি না থাকলেও ছোট থেকেই লেখাপড়ার প্রতি শরিফের প্রবল ইচ্ছা ছিল। এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে সে, কিন্তু তার হয়ে যে পরীক্ষার খাতায় লিখে দেবে, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। এটা নিয়ে মন খারাপ করে থাকে শরিফ। শরিফের পক্ষে খাতায় লেখার কেউ না পেলে তার পরীক্ষা দেওয়া হবে না, এটা ভাবতেই কষ্ট লাগে।’
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতাহার উল আলম বলেন, ‘শরিফের প্রতি আমাদের সহানুভূতি রয়েছে। তাঁকে পরিচিতদের মধ্য থেকে একজনকে শ্রুতলেখক হিসেবে খুঁজতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত না পেলে, আমরাই শ্রুতলেখকের ব্যবস্থা করে দেব।’