
নদের পানিতে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মুরগি; ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে ডাব, গাব, লবণ, বাতাসা আরও কত–কী। কেউ কেউ পানিতে ঝাঁপিয়ে সেগুলো ধরছেন, তুলে আনছেন তীরে। পৌষসংক্রান্তিতে পুণ্যার্থীরা ভৈরব নদে স্নানের পাশাপাশি এভাবে মানত শোধ করছিলেন। অদূরে নদের পাড়জুড়ে বসেছে পৌষসংক্রান্তির মেলা, এটিকে ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। সবচেয়ে বেশি লোকের ভিড় মেলাতেই।
ভৈরব নদের তীরে নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটী গ্রামে বসা এই আয়োজন স্থানীয়দের কাছে ‘আফরার মেলা’ নামেও পরিচিত। প্রায় ১০৯ বছর ধরে বসা এই মেলায় গতকাল বুধবার দিনব্যাপী আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভিড় করেন কয়েক হাজার মানুষ। মেলাকে কেন্দ্র করে কয়েক শ বিক্রেতা তাদের পসরা সাজিয়ে বসেন। সেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল মানুষের ঢল।
কী নেই এই মেলায়! শখের হাঁড়ি, মাটির সরা, ফুল, শোলার ফুল, মাটির পুতুল, কাঠের একতারা, বাঁশের বাঁশি, বাঁশ ও বেতের সামগ্রী, লোহার দা-বঁটি-কাঁচি, শিশুদের নানা খেলনা, মোয়া, মুড়কি, বাতাসা ও নানা ধরনের মিষ্টি। ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্যের নাগরদোলা, শিশুদের জন্য মঞ্চে লাফঝাঁপের ব্যবস্থা। আর ছিল মানত করা মুরগি, ডাব, গাব, লবণ ও বাতাসা নদের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়ার পর সেগুলো ধরতে লোকজনের ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্য—যা এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ।
গতকাল বিকেলে মেলায় গিয়ে দেখা যায়, পশ্চিম দিক থেকে আসা ভৈরব নদ সেখানে এসে আচমকা বাঁক নিয়েছে। এই বাঁক থেকে নদ দুই ভাগে বিভক্ত—একটি শাখা সোজা দক্ষিণে, আরেকটি কিছুটা উত্তরে গিয়ে পূর্বমুখী হয়েছে। নদের পশ্চিম ও দক্ষিণ পাড়ে যশোর সদর উপজেলা, আর পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে নড়াইল সদর উপজেলা। এই ত্রিমোহিনীর তীরে একটি প্রাচীন বটগাছের চারপাশজুড়ে বসেছে মেলা।
আয়োজকেরা জানান, শেখহাটী গ্রামে ‘মা ভুবনেশ্বরীর’ একটি শতবর্ষী মন্দির আছে। প্রায় ১০৯ বছর আগে থেকে এই দিনে গঙ্গাস্নানের আয়োজন শুরু হয় এবং মেলাটিও বসছে। মুসলমান ও হিন্দু—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই এই মেলায় মানত করেন। মেলার দিন তাঁরা মানত শোধ করতে এসে মুরগি, ডাব, গাব, লবণ ও বাতাসা নদের পানিতে ভাসিয়ে দেন।
মেলাটি এক দিনের জানিয়ে আয়োজকেরা বলেন, ভোর থেকেই পুণ্যার্থীরা ভৈরব নদে স্নান করেন। এরপর মানত শোধ করেন। সকাল থেকে মেলা শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলে। দুপুরের পর মেলায় লোকসমাগম সবচেয়ে বেশি হয়।
নড়াইল সদর উপজেলার গুয়াখোলা গ্রামের গৃহবধূ স্মৃতি পাল (৪৮) বলেন, ‘প্রতিবছরই মেলায় আসি। এবার মেয়ে আর নাতনিকে নিয়ে এসেছি। ঘুরে ঘুরে পরিবারের জন্য কিছু জিনিস কিনেছি।’
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর গ্রামের খুকু বৈরাগী (৭৪) বলেন, ‘আগে একবার মেলায় এসেছিলাম। এবার এসেছি মানত শোধ দিতে। একটি ডাব, একটি গাব আর এক কেজি লবণ পানিতে ভাসিয়ে মানত শোধ করেছি।’
মেলায় বেতের তৈরি ধামা ও লক্ষ্মীর ডালা নিয়ে এসেছিলেন যশোরের কেশবপুর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের রণজিত দাস (৭০)। তিনি বলেন, ৪০ বছর ধরে এই মেলায় বেতের সামগ্রী বিক্রি করছেন। এবার ৩০টি ধামা আর ৩০টি লক্ষ্মীর ডালা এনেছিলেন। সন্ধ্যার আগেই সব বিক্রি হয়ে গেছে।
মেলায় মাটির তৈরি তৈজসপত্রের দোকান সাজিয়ে বসেছেন নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটী গ্রামের রঞ্জন পাল (৫৮)। তিনি জানান, বেচাকেনা ভালোই হচ্ছে।
মেলার এক কোণে মিষ্টির দোকান দিয়ে বসেছেন যশোর সদর উপজেলার রূপদিয়া গ্রামের শুকদেব বিশ্বাস (৬২)। তিনি বলেন, ‘এক হাঁড়ি মিষ্টি মেলায় নিয়ে এসেছি। সন্ধ্যার আগে সব মিষ্টি বিক্রি হয়ে গেছে।’
নড়াইল সদর উপজেলার কাইজদিয়া গ্রামের হাফিজ শেখ (৬৪) বলেন, ‘দুই বছর পর আবার মেলায় এলাম। নাতিকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে মেলা দেখছি, এটা-ওটা খাচ্ছি।’
মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি অরুণ সাহা বলেন, ১০৯ বছর ধরে চলে আসা এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর এলাকায় এক মিলনমেলা ও উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
একই কথা জানান আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও যশোর সদর উপজেলার সিঙ্গিয়া আদর্শ ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সুজিত বিশ্বাস বলেন, প্রতিবছরই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এই মেলায় আসেন। এবারও বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছে।