মেঘনায় পড়ে স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাসরিন আক্তার। আজ শুক্রবার চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার লঞ্চঘাটে
মেঘনায় পড়ে স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাসরিন আক্তার। আজ শুক্রবার চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার লঞ্চঘাটে

লঞ্চঘাটের পন্টুনে গৃহবধূর আহাজারি

‘আমার স্বামীর কী হইছে? এহন আমার সাড়ে চার বছরের মেয়ের কী অইব?’

‘আমাকে ও মেয়েরে দেখতে মাসে দুই-তিনবার নারায়ণগঞ্জ থেইকা আমার বাপের বাড়িতে আসত। দুধের বোতল নিয়া আসত। নারায়ণগঞ্জে যাওয়ার সময় দুধ নিয়া যাইত। আজও আমার কাছে আওনের জন্য লঞ্চে উঠছে। হায় আল্লাহ, আমার স্বামীর কী হইছে। এহন আমার সাড়ে চার বছরের মেয়ের কী অইব।’

আহাজারি করতে করতে স্থানীয় সংবাদকর্মী ও লোকজনের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন লঞ্চ থেকে পড়ে মেঘনায় নিখোঁজ হওয়া মো. রবিন হোসেনের (৩৬) স্ত্রী নাসরিন আক্তার। আজ শুক্রবার বিকেল চারটায় চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার লঞ্চঘাট এলাকায় পন্টুনে স্বামীর খোঁজে আসেন তিনি।

পরিবার, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, নাসরিনের বাড়ি মতলব উত্তর উপজেলার নবীপুর গ্রামে। বিয়ের পর থেকে বাবার বাড়িতেই থাকছেন তিনি। তাঁর স্বামী রবিন আজ বেলা ১১টার পর ষাটনল লঞ্চঘাট এলাকায় লঞ্চ থেকে পন্টুনে লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে মেঘনায় পড়ে নিখোঁজ হন। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত তাঁকে উদ্ধার করা যায়নি।

নিখোঁজ রবিন হোসেনের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায়। বাবা হায়দার আলী, মা রোকেয়া বেগমসহ পরিবারের সঙ্গে তিনি নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকায় থাকতেন। নারায়ণগঞ্জে চাকরি করতেন। মাসে দু-একবার মতলব উত্তর উপজেলার নবীপুর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে আসতেন।

স্বামীর মুঠোফোন বন্ধ পেয়ে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়ে আজ বিকেলে ষাটনল লঞ্চঘাট এলাকায় ছুটে আসেন নাসরিন। লঞ্চ থেকে ঘাটের পন্টুনে নামতে গিয়ে মেঘনায় পড়ে স্বামীর নিখোঁজ সংবাদ জেনে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। পুলিশ, প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এবং সংবাদকর্মীরা তাঁকে কিছুতেই সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না। তাঁর আহাজারিতে লঞ্চঘাট এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

লঞ্চঘাটের পন্টুনে দাঁড়িয়ে নাসরিন বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক দিন বেকার আছিল। এ জন্য আমাকে বাপের বাড়িতে রাখছে। সে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জে থাকত। দুই মাস আগে তার চাকরি অইছে। আমারে কইছে, মেয়েসহ হের কাছে নিয়া যাইব।’

আহাজারি করতে করতে নাসরিন বলেন, ‘আমার এহন কী অইব। আমার একমাত্র মেয়ের কী অইব। আমি কই যামু, কী করুম। আল্লাহ, তুমি কী করলা। মেয়েটা বলতেছে, “আমার বাবার কী অইছে।” আমার স্বামী তো সাঁতার জানে। ক্যামনে নদীতে ডুইবা নিখোঁজ অইল। কেউ কি তারে তুলতে পারল না।’

নিখোঁজ রবিন হোসেনকে উদ্ধারে ডুবুরি দলের তৎপরতা

পুলিশ জানায়, রবিন আজ সকাল সাড়ে নয়টায় নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল থেকে মকবুল-২ নামে চাঁদপুরগামী একটি যাত্রীবাহী লঞ্চে ওঠেন। লঞ্চটি ষাটনল লঞ্চঘাট এলাকায় পৌঁছালে তিনি প্রথমে লঞ্চ থেকে ঘাটের পন্টুনে নামেন। এ সময় ভুল করে তাঁর সঙ্গে থাকা একটি ব্যাগ লঞ্চে রেখে আসেন। ফেলে আসা ব্যাগ আনার জন্য আবার লঞ্চে ওঠেন। ব্যাগ নিয়ে লঞ্চ থেকে লঞ্চঘাটের পন্টুনে লাফ দেওয়ার সময় লঞ্চটি ছেড়ে দেয়। এতে তিনি মেঘনা নদীতে ব্যাগসহ পড়ে নিখোঁজ হন।

খবর পেয়ে উপজেলার মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ি, চাঁদপুর ফায়ার সার্ভিস বিভাগের ডুবুরি দল ও বিআইডব্লিউটিএ বিভাগের তিনটি দল সম্মিলিতভাবে আজ দুপুর ১২টার পর থেকে সেখানে উদ্ধার অভিযান চালায়।

মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. রুহুল আমিন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, নিখোঁজ তরুণের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত তাঁকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা যায়নি। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

রুহুল আমিন বলেন, লঞ্চের সুকানি মো. মনির হোসেন ও তাঁর সহযোগী মো. সুমন মিয়াকে লঞ্চসহ আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি।