পাঁচ কিশোরের হাতে ধারালো অস্ত্র—কারও হাতে কিরিচ, কারও হাতে লোহার চাকতি। সড়কে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ভিডিও ধারণ করে সম্প্রতি সেটি টিকটকে ছড়িয়ে দিয়েছিল তারা
পাঁচ কিশোরের হাতে ধারালো অস্ত্র—কারও হাতে কিরিচ, কারও হাতে লোহার চাকতি। সড়কে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ভিডিও ধারণ করে সম্প্রতি সেটি টিকটকে ছড়িয়ে দিয়েছিল তারা

কিশোর গ্যাংয়ের ‘বড় ভাই’ বদলেছে, বেড়েছে উৎপাত

আওয়ামী লীগ আমলে যুবলীগ নেতার আশ্রয়ে থাকা ১৬ মামলার আসামি চট্টগ্রামের মো. মুরাদকে এখন বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতার পালাবদলে এভাবে কিশোর গ্যাংয়ের রাজনৈতিক আশ্রয় বদলেছে।

চট্টগ্রামের বাকলিয়ার মুরাদ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছিলেন নগর যুবলীগের আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর আশ্রয়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁকে দেখা যায় নগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক ওরফে বাদশার সঙ্গে মিছিল-সমাবেশে। নিজের ফেসবুক পরিচয়ে মুরাদ নিজেকে চান্দগাঁও থানা যুবদলের সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মুরাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রবাজি, জায়গা দখল ও মাদক ব্যবসায় কিশোর গ্যাং ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গত রোববার বাকলিয়ায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁর লোকজনের সঙ্গে প্রতিপক্ষের সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়। পরদিন নগর যুবদল বিবৃতি দিয়ে জানায়, মুরাদ তাদের দলের কেউ নন। এমদাদুল হকও মুরাদকে নিজের অনুসারী হিসেবে অস্বীকার করেছেন।

মুরাদ একা নন। পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্ন নেতার আশ্রয়ে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের কিছু নেতা-সদস্য এখন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেছেন।

পুলিশের ভাষ্য, নগরের অন্তত ৪৫টি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য রয়েছে। তবে চট্টগ্রাম শহরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে ১১টি গ্যাংয়ের নাম সবচেয়ে বেশি এসেছে। সেগুলো হলো মুরাদপুর এলাকার এমবিএস (মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট), পাঁচলাইশের কেবি (খতিবের হাট), এনএস (নাজিরপাড়া), ৯৯৯, এক্স-মার্ক, ব্যাকহোল, ডট গ্যাং, বিঙ্গু, পাইথন, সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার।

গত সপ্তাহেও মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে নগরের দুই এলাকায় কিশোর গ্যাংকে ঘিরে গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনা ঘটে। গত মঙ্গলবার খুলশীর পাহাড়তলী ওয়্যারলেস কলোনিতে ‘ফাইভ স্টার’ ও ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের বিরোধে খুন হয় ১৬ বছরের মো. হৃদয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবার সঙ্গে ফুটপাতে সবজি বিক্রি করত সে।

পুলিশের হিসাবে, গত সাড়ে সাত বছরে চট্টগ্রাম নগরে অন্তত ৬৩৫টি অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে খুনের ঘটনাই ৩৯টি।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার (সিএমপি) হাসান মো. শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের একার পক্ষে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতাদেরও কিশোর গ্যাং সদস্যদের কাছে ভিড়তে দেওয়া উচিত নয়।

পুরোনো গ্যাং, নতুন আশ্রয়

২০১৮ সালে স্কুলছাত্র আদনান ইসফার হত্যার পর চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাং নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনা শুরু হয়। পরের বছর পুলিশ ৪৮ জন পৃষ্ঠপোষকের তালিকা করে। এলাকায় তাঁরা ‘বড় ভাই’ হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের মার্চে ওই তালিকায় আরও ১৬ জনের নাম যুক্ত হয়।

পুলিশের হিসাবে, এসব পৃষ্ঠপোষকের আশ্রয়ে প্রায় ২০০ কিশোর গ্যাংয়ে অন্তত ১ হাজার ৪০০ সদস্য সক্রিয় ছিল। এরপর পূর্ণাঙ্গ তালিকা আর হালনাগাদ হয়নি। তবে পুলিশের ধারণা, গ্যাং ও সদস্য—দুটির সংখ্যাই এখন বেড়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত তালিকাভুক্ত অনেক পৃষ্ঠপোষক গা ঢাকা দেন। কিন্তু তাঁদের আশ্রয়ে থাকা কিশোর গ্যাংগুলোর নেতা-সদস্যদের বড় অংশ এলাকায় থেকে যায়।

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে পুলিশ ও নগরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অন্তত ৩০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের কেউ কেউ এখন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছেন।

নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্ন নেতার আশ্রয়ে থাকা কিছু কিশোর গ্যাং নেতা-সদস্য এখন বিএনপির অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে থাকছেন। তাঁর ভাষ্য, এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। যারা তাদের আশ্রয় দিচ্ছেন, তাঁদের সতর্ক করা হচ্ছে।

পুলিশের একার পক্ষে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতাদেরও কিশোর গ্যাং সদস্যদের কাছে ভিড়তে দেওয়া উচিত নয়।
হাসান মো. শওকত আলী, সিএমপি কমিশনার

বেপরোয়া গ্যাং, আতঙ্কে মানুষ

কিশোর গ্যাং সম্পৃক্ততায় চট্টগ্রাম নগরে আরেক আলোচিত নাম ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা। অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির ২৩ মামলার এই আসামিকে গত ৮ জুন নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, মঙ্গলবার রাতে হৃদয় হত্যায় অভিযুক্ত ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের সঙ্গে ওয়াকিলের যোগাযোগ রয়েছে।

ঘটনার পরদিন বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। অন্তত আটজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

ওয়াকিলকে কেন ভয় পান—এমন প্রশ্নে তাঁদের বক্তব্য প্রায় একই। তাঁরা বলেন, ওয়াকিলের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের একটি বাহিনী রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে কিংবা বিরোধে জড়ালে ওই গ্যাংয়ের সদস্যরা হামলা ও নাজেহাল করে, এমন ভয় এলাকায় রয়েছে।

পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর কলেজ ওয়্যারলেস কলোনি এলাকাতেই। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে এলাকার অনেক মানুষ কিশোর গ্যাংয়ের কাছে জিম্মি। ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না।

মিজানুর রহমান নিজেও হামলার শিকার হয়েছেন। গত ২৯ আগস্ট ওয়াকিলের কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে তাঁকে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় ওয়াকিল ও তাঁর সহযোগীদের আসামি করে মামলা করেন তিনি।

ওয়াকিল পলাতক থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাই রকি হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

মাদক ব্যবসার ঢাল কিশোরেরা

কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মাদক ব্যবসার যোগসূত্রও বাড়ছে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য। মাদক বিক্রির স্থান নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষকে হটানো, স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয় দেখানো, এমনকি পুলিশের অভিযানে বাধা দিতেও কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত আট মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ওপর এ ধরনের হামলার অন্তত পাঁচটি ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ জুলাই ডবলমুরিংয়ের আমবাগানে মাদক মামলার এক আসামিকে ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হয় পুলিশ। ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন এসআই মবিনুল ইসলাম। পুলিশের ওয়াকিটকিসহ সরঞ্জামও ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নগরের শতাধিক মাদক বিক্রির স্থানে কোনো না কোনোভাবে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি-৭) চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মাদকের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সংযোগ রয়েছে। মাদকাসক্ত হওয়ার পর অনেকেই চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে একপর্যায়ে গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়।

আ.লীগ আমলে বিভিন্ন নেতার আশ্রয়ে থাকা কিছু কিশোর গ্যাং সদস্য এখন বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে থাকছেন। এতে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
নাজিমুর রহমান, সদস্যসচিব, নগর বিএনপি

অপরাধ বাড়ে, ঝুলে থাকে বিচার

কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের পাশাপাশি পুরোনো মামলার বিচারেও দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। চট্টগ্রামে কিশোর অপরাধের ১ হাজার ৬২৩টি মামলা বিচারাধীন। আদালতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, সাক্ষী হাজির না হওয়ায় অনেক মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না।

২০১৮ সালের আদনান ইসফার হত্যা মামলাটিও এখনো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে চলছে। ২৬ সাক্ষীর মধ্যে ১৭ জনের সাক্ষ্য হয়েছে। সাত আসামিই জামিনে। গত বছরে হালিশহরে কলেজছাত্র ওয়াহিদুল হক ওরফে সাব্বির হত্যা এবং গত এপ্রিলে চকবাজারে কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদ হত্যার মামলাও তদন্তাধীন।

সুজন চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরীর প্রথম আলোকে বলেন, শুধু গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার সমাধান হবে না। যাঁরা তাদের আশ্রয় দিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে ‘বড় ভাই’ বদলাবে, কিশোর গ্যাং থেকে যাবে।