
মঙ্গলবার বিকেল। রাজশাহীর তানোর উপজেলা সদরের একটি চায়ের দোকানে নির্বাচন নিয়ে চলছে নানা কথাবার্তা। বিএনপির একজন কর্মী ক্ষোভের সঙ্গে বলে বসলেন, ‘১৭ বছর যাঁদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে দেখেছি, তাঁদের এখন আবার বিএনপির মিছিলে দেখছি। নেতারা মনে করছেন যে, পাস করার জন্য আওয়ামী লীগের ভোট লাগবে। এতে নিজেদের কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে—এদিকে কেউ নজর দিচ্ছেন না।’
ওই ব্যক্তি আরও বলেন, গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ বিএনপির ওপর অনেক নির্যাতন করেছে। এই ১৫ মাসে বিএনপির বিরুদ্ধেও অনেক অভিযোগ উঠেছে। এই ক্ষোভে আওয়ামী লীগের ভোট জামায়াতের দিকেও চলে যেতে পারে।
তবে তানোর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আখেরুজ্জামান হান্নান দাবি করেন, আওয়ামী লীগের ভোটারদের ৮০ শতাংশ ভোট বিএনপি পাবে। একইভাবে হিন্দু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভোটও পাবে।
রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনটি ২০০৮ সাল থেকে সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। এবার এখন পর্যন্ত এই আসনে বিএনপি-জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে জয় পেতে দুই দলই আওয়ামী লীগের ভোটের আশা করছে। বিশেষ করে এই আসনে প্রায় ৭০ হাজার সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভোটার রয়েছে। তাঁরা আওয়ামী লীগের ‘ভোটব্যাংক’ বলে একটা প্রচার রয়েছে। সব মিলিয়ে এবার হিসাবটা দাঁড়িয়েছে এমন—এই আসনের আওয়ামী লীগের ভোটেই প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারিত হবে।
৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬২ জন ভোটারের আসনটিতে আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন চারজন। তবে ভোটের মাঠে আলোচনা বিএনপির প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমানকে ঘিরে। শরীফ উদ্দীন বিএনপির চেয়ারপারসনের সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন। আর মুজিবুর রহমান জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির। ১৯৮৬ সালে তিনি একবার এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল।
এর আগে ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পরপর তিনটি নির্বাচনে আসনটিতে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন শরীফ উদ্দীনের বড় ভাই আমিনুল হক। তিনি বিএনপিদলীয় মন্ত্রীও ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭৮৬ ভোট। সেবার বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হকের ভাই এম এনামুল হক (সাবেক পুলিশপ্রধান) পেয়েছিলেন ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৫০ ভোট।
নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই আসনে প্রায় ৭০ হাজার সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভোটার রয়েছে। ইতিমধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুজন নেতা সরাসরি জামায়াতের মঞ্চে উঠে তাঁদের সমর্থন দিয়েছেন। তাঁদের একজন হচ্ছেন তানোর উপজেলার হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি দেবানন্দ বর্মন। তিনি গত কয়েক দিন আগের তানোরের মুন্ডুমালা পৌর এলাকায় জামায়াতের একটি নির্বাচনী সভায় দাঁড়িয়ে নিজেকে আওয়ামী লীগের কর্মী পরিচয় দিয়ে বলেন, তাঁর দল আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে নেই। তাঁদের সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তিনি দাঁড়িপাল্লাকে সমর্থন জানান। তানোরের দশরথ দাস নামের আরেক ব্যক্তি জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারে একইভাবে অংশ নিচ্ছেন। তবে নেতারা ছাড়া সাধারণ ভোটাররা সবার কাছে মুখ খুলছেন না।
মঙ্গলবার বিকেলে তানোর উপজেলার পাঁঠাকাটার মোড়ে রাস্তার মাটি কাটার কাজ করছিলেন ১২ জন সাঁওতাল ও কর্মকার সম্প্রদায়ের নারী। ভোটের বিষয়ে একজন বললেন, তাঁর স্বামী মহল্লার সরদার। তিনি এখন পর্যন্ত মুখ খোলেননি, কাকে ভোট দিতে হবে। ওই নারী বলেন, ‘আমরা কী করব, বুঝতে পারছি না। যে দল হারবে, সেই দল হয়তো ভোটের পরে এসে হামলা করবে, বলবে—“তোরা ভোট দিসনি”।’
তানোরের বাধাইড় ইউনিয়নের সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভোটার বেশি। এই গ্রামের পলাশ নামের একজন বাঙালি গৃহস্থ জানালেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লোকজন তাঁর জমিতে কাজ করেন। তাঁদের কাছে ভোটের বিষয়ে জানতে চাইলে বলছেন, তাঁরা ভোট দিতে যাবেন, কিন্তু কাকে ভোট দেবেন, তা এখনই বলছেন না।
গ্রামের সাইমন মার্ডি নামের একজন ভোটার বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত দুই দলেরই প্রতিনিধি গ্রামে রয়েছেন। তাঁরাই মিছিল-মিটিং যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ কী হয়, না হয়—এই নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন।’ গ্রামের ভোটার সরল মার্ডি বললেন, ‘দাদা, এখনো জানি না, কী করা হবে।’
গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়নের একজন আওয়ামী লীগের নেতা সদ্য জেল থেকে বের হয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, তাঁর নামে একাধিক মামলা দিয়েছেন বিএনপির লোকজন। মামলার বাদী তাঁকে চেনেন না। অথচ আসামি করে দিয়েছেন। এ রকম অনেক গ্রামে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কিছুই জানেন না, কিন্তু তাঁদের থানা লুটের মামলার আসামি করা হয়েছে। তাঁরা বিএনপির ওপর নাখোশ। এই ক্ষোভে নেতারা না হলেও সাধারণ অনেক কর্মীই জামায়াতকে ভোট দিয়ে দিতে পারে। আওয়ামী লীগের ওই নেতা বলেন, তাঁদের গ্রামের কেন্দ্রে কোনো দিন জামায়াত জিততে পারেনি। এবার এই কেন্দ্রে জামায়াত জিতে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
কথা হয় ইউনিয়নের মান্ডইল বাজারের একজন সার-কীটনাশক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিনিও বিএনপির ব্যাপারে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভের কথা জানালেন।
গোদাগাড়ীর প্রেমতলীর এক বিএনপি নেতা মামলা করেছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নামে। ওই মামলার আসামি গোদাগাড়ী পৌর সদর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল জলিলের ছেলে। আব্দুল জলিল জানালেন, মামলায় তাঁর ছেলের নাম এজাহারে নেই। দোকান থেকে তাঁর ছেলেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিনিও এখনো এলাকায় ঠিকমতো থাকতে পারছেন না।
এই আসনের আলোচিত দুই প্রার্থীর কারও সঙ্গেই কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাঁরা ফোন ধরেননি। গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম দাবি করেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গেলে বিএনপিকেই ভোট দেবেন। তাঁর দাবি, ২০০৮ সালেও ডিজিটাল কারচুপি হয়েছিল। এই আসনে বিএনপির যে ভোট আছে, সেই ভোটেই বিএনপি পাস করবে। তবে আওয়ামী লীগের ভোট পেলেই লাভ।
আর গোদাগাড়ী উপজেলা জামায়াতের আমির নুমাউন আলী বলেন, তাঁরা কারও নামে হয়রানিমূলক মামলা করেননি। নির্বাচনে জিতলেও করবেন না, হারলেও করবেন না। তাঁদের সঙ্গে কেউ খারাপ আচরণ করলেও তাঁরা এমনভাবে উত্তর দিচ্ছেন যেন বাড়িতে গিয়ে লোকটার অনুশোচনা হয়। তাই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জামায়াত।