রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সম্প্রতি তোলা
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সম্প্রতি তোলা

‘রত্না আমাদের ছেড়ে চলে গেল, তাঁর ছোট দুইটা সন্তান নিয়ে কী করব’

সন্তান প্রসবের পর শারীরিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছিল রত্না বেগমকে (৩০)। চিকিৎসক জানান, অস্ত্রোপচার করতে হবে রত্নার। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার করানোর মতো চিকিৎসক নেই। উপায় না দেখে রত্না বেগমকে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে ভাড়া করা হয় অ্যাম্বুলেন্স। তবে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনেই মৃত্যু হয় রত্নার।

গত শুক্রবার সকালে ঘটেছে এ ঘটনা। রত্না বেগম লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়নের তালতলা গ্রামের বাসিন্দা। মৃত্যুর আগে বৃহস্পতিবার রাতে একটি ছেলেসন্তান প্রসব করেন তিনি। গভীর রাতে প্রসববেদনা ওঠায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বাড়িতেই সন্তানের জন্ম হয়।

ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। সময়মতো অস্ত্রোপচার করা গেলে হয়তো রত্নাকে বাঁচানো সম্ভব হতো। আমরা খুব অসহায় অবস্থায় ছিলাম। লক্ষ্মীপুর সদরে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়াটুকুও অন্য একজনের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছিল।
সেলিনা আক্তার, রত্নার বেগমের খালা।

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রসবের পর গর্ভফুল (প্লাসেন্টা) বের না হওয়ায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণসহ নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় রত্নার। তাই তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা না থাকায় অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্যকর্মীরা। এই অবস্থায় লক্ষ্মীপুর জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল। এর মধ্যেই মৃত্যু হয়েছে রত্নার।

রত্নার মায়ের কোলে কান্না করছে তাঁর ১৩ মাসের শিশু আয়েশা। পাশে বসে রয়েছেন রত্নার খালা সেলিনা আক্তার। গতকাল বিকেলে তোলা

রত্নার স্বামী সাইফুল ইসলাম সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। রত্না কেরোয়া গ্রামে তাঁর বাবা মো. মনু মিয়ার বাড়িতে থাকতেন। ঘরে নবজাতকটি ছাড়াও আয়েশা আক্তার নামে ১৩ মাস বয়সী একটি কন্যাশিশু রয়েছে রত্না-সাইফুল দম্পতির।

আমার স্ত্রীর গাইনিবিষয়ক সমস্যা ছিল। চিকিৎসক জানিয়েছেন, জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করতে হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, অপারেশন থিয়েটার আছে, কিন্তু অপারেশন হয় না। সরকারি হাসপাতালে যদি এই সেবা থাকত, তাহলে বাইরে গিয়ে এত টাকা খরচ করতে হতো না।
মোশাররফ হোসেন, কমলনগরের বাসিন্দা।

রত্নার খালা সেলিনা আক্তার বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। সময়মতো অস্ত্রোপচার করা গেলে হয়তো রত্নাকে বাঁচানো সম্ভব হতো। আমরা খুব অসহায় অবস্থায় ছিলাম। লক্ষ্মীপুর সদরে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়াটুকুও অন্য একজনের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছিল।’

সেলিনা আক্তার আরও বলেন, ‘হাসপাতালে নেওয়ার আগেই রত্না আমাদের ছেড়ে চলে গেল, এখন তাঁর ছোট দুইটা সন্তান নিয়ে আমরা কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। নবজাতকটি মায়ের বুকের দুধ, আদর কিছুই পেল না। ছোট আয়শাও শুধু তার মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।’

ওটি আছে, তবু বন্ধ অস্ত্রোপচার

রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যার। অস্ত্রোপচারের জন্য অপারেশন থিয়েটারসহ (ওটি) প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও কেবল চিকিৎসক সংকটের কারণে দুই বছর ধরে হাসপাতালটিতে অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে।

কর্তৃপক্ষ জানায়, হাসপাতালটিতে সার্জারি ও গাইনি চিকিৎসক নেই। নেই অ্যানেসথেসিওলজিস্টও। ফলে অস্ত্রোপচার বন্ধ রাখা হয়েছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নেন।

সম্প্রতি রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটার। প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ বর্গফুটের কক্ষটিতে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব যন্ত্রপাতিই রয়েছে। সাজানো-গোছানো কক্ষটি দেখে বোঝার উপায় নেই, দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্রোপচার সেবা বন্ধ।

প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকলেও বন্ধ রয়েছে অস্ত্রোপচার সেবা। সম্প্রতি রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে

একই অবস্থা জেলার আরও দুই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে

রায়পুরের মতো চিকিৎসক সংকটে অস্ত্রোপচার সেবা দেওয়া যাচ্ছে না রামগতি ও কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও। বেশ কয়েক বছর ধরে দুটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। অথচ এই দুটি হাসপাতালেও অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না করায় অস্ত্রোপচার কক্ষের অনেক মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে।

হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, বাধ্য হয়ে তাঁদের বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালে অস্ত্রোপচার সেবা নিতে হচ্ছে। এতে বাড়তি টাকা খরচ হয়। অনেক রোগী টাকার অভাবে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, অস্ত্রোপচার চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক পদায়নের জন্য প্রতি মাসেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সংকটের বিষয়ে অবহিত করা হয়। তবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যার। এখানে ২০১৯ সাল থেকে অস্ত্রোপচার সেবা বন্ধ। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ২৪টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮ জন। গাইনি, সার্জারি, শিশু, মেডিসিন, অ্যানেসথেসিওলজি ও বাতজ্বর বিভাগের কোনো চিকিৎসক নেই। প্রতিদিন গড়ে ৬০০ রোগীকে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও ৩১ শয্যার। সেখানে সর্বশেষ অস্ত্রোপচার হয়েছে ২০২০ সালের নভেম্বরে। এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও গাইনি, সার্জারি, শিশু, মেডিসিন ও অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের চিকিৎসক নেই। প্রতিদিন হাসপাতালটির বহির্বিভাগে গড়ে ৫০০ রোগী চিকিৎসা নেন।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার সেবা বন্ধ থাকায় বাসিন্দাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। রামগতির চরগাজী ইউনিয়নের আবদুল সাত্তার জানান, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তিনি অস্ত্রোপচারের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। হাত ভাঙার চিকিৎসা নিতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, অস্ত্রোপচার সেবা বন্ধ রয়েছে। পরে তাঁকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে লক্ষ্মীপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। আবদুল সাত্তার বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এত খরচ বহন করা কঠিন।’

কমলনগরের বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমার স্ত্রীর গাইনিবিষয়ক সমস্যা ছিল। চিকিৎসক জানিয়েছেন, জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করতে হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, অপারেশন থিয়েটার আছে, কিন্তু অপারেশন হয় না। সরকারি হাসপাতালে যদি এই সেবা থাকত, তাহলে বাইরে গিয়ে এত টাকা খরচ করতে হতো না।’

রায়পুর উপজেলার বামনী ইউনিয়নের সুজন পাটোয়ারী জানান, গত বুধবার তাঁর স্ত্রীর প্রসবব্যথা ওঠে। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের বিষয়ে পরামর্শ দেন। পরে স্ত্রীকে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জানতে পারেন, সেখানে অস্ত্রোপচার বন্ধ। বাধ্য হয়ে তাঁকে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।

রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কামনাশিস মজুমদার বলেন, ‘সার্জারি, গাইনি ও অ্যানেসথেসিওলজিস্টসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। এ কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন কার্যক্রম চালু করা যাচ্ছে না। এই উপজেলার অধিকাংশ মানুষ নিম্ন আয়ের। তা ছাড়া উপজেলায় বেসরকারি হাসপাতালও নেই। তাই মানুষ অনেক বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।’

জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন বাহারুল আলম বলেন, ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকসংকটের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। চিকিৎসক পদায়ন হলে অস্ত্রোপচার শুরু করা যাবে।’