
মেঘনার পূর্ব পাড় ও ধনাগোদার পশ্চিম পাড়ের মাঝে ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধ। বাঁধের ভেতরে রাশি রাশি বোরো ধানখেত। খেতের পাকা ও আধা পাকা বোরো ধানের ফলন মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে চারপাশে। সোনালি ধানের ঢেউ আছড়ে পড়ছে চারদিকে। তবে বাম্পার ফলনে কৃষকের মনে স্বস্তি মিললেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় রয়েছে অস্বস্তিও। সব ফলন ঘরে তোলার আগে ঝড় তুফানে বিনষ্ট হওয়ার শঙ্কা।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের বেড়িবাঁধের ভেতরের চিত্র এটি। গত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া চলতি মৌসুমে উপজেলার প্রায় ৩৮ হাজার কৃষক সেখানে আবাদ করেন নানা জাতের বোরো ধান। গোটা এলাকায় চলছে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের উৎসব। কৃষকের ঘরে ঘরে এখন নবান্নের আমেজ।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১০ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৩ হাজার ১৮৬ মেট্রিক টন। কৃষকেরা ব্রি-২৮, ২৯, ৫৮, ৭৪, ৮১ ও ৮৮-সহ নানা উন্নত জাতের বোরো আবাদ করেন। গত বছরে বোরোর আবাদ হয়েছিল ৯ হাজার ৯৮৪ হেক্টর জমিতে। গতবারের তুলনায় এবার বেশি জমিতে বোরোর আবাদ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বেলা ১১টায় মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের বেড়িবাঁধের ভেতরে ব্রাহ্মণচক, সাদুল্যাপুর, পশ্চিম দুর্গাপুর, ফতেপুর, লুধুয়া, হরিণা, মিলারচর, পূর্ব হানিরপাড়, মধ্য হানিরপাড়, লুধুয়া, মান্দারতলী ও উত্তর রাঢ়ীকান্দিসহ উপজেলার আরও কয়েকটি এলাকায় দেখা যায়, সেখানে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ধানখেত। খেতের পাকা ও আধা পাকা ধানের ফলনের ভারে নুইয়ে আছে গাছের ডগা। খেতে দোল খাচ্ছে বৈশাখী বাতাস। কৃষক ও শ্রমিকেরা ব্যস্ত ধান কাটা ও মাড়াইয়ে। এ যেন একটুকরা ‘সোনালি ধানের রাজ্য’।
কথা হয় মিলারচর গ্রামের কৃষক আল মামুন, পূর্ব হানিরপাড় গ্রামের লাল মিয়া, মান্দারতলী গ্রামের আলাউদ্দিন ও মধ্য হানিরপাড় গ্রামের মো. স্বপনসহ কয়েকটি গ্রামের অন্তত ১০ জন কৃষকের সঙ্গে।
মিলারচর গ্রামের আল মামুন বলেন, চলতি মৌসুমে ১০০ শতক জমিতে ব্রি-২৯ জাতের বোরোর আবাদ করেছেন। ফলন খুব ভালো হয়েছে। অধিকাংশই এখনো কাটেননি। কিছু পাকা ধান কেটেছেন। ধানখেতে এ পর্যন্ত তাঁর খরচ হয়েছে ৬৫ হাজার টাকা। কাটা ও মাড়াইয়ে আরও ৩০ হাজার টাকা খরচ হবে। খেতে ধান পাবেন প্রায় ৮০ মণ। বিক্রি হবে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ধান কইরা লাভ নাই, না কইরাও উপায় নাই। বাজারে চালের দাম বেশি অথচ ধানের দাম কম। লোকসান দিয়া আর কত ধান লাগামু?’
পূর্ব হানিরপাড় গ্রামের কৃষক লাল মিয়ার ভাষ্য, ‘খেতে ধানের ফলন ভালো অওনে খুব খুশি ও স্বস্তি লাগতাছে। তয় ধানের দর ভালা না। এলিগা অস্বস্তিও আছে। এ ছাড়া আবহাওয়ার যে লক্ষণ তাতে সব ধান কাটতে পারুম কি না সন্দেহ। খেতের ধান নিয়া টেনশনে আছি।’
এবার প্রত্যাশিত ফলন হয়েছে জানিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ফয়সাল মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষি কার্যালয়ে থেকে কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে ধানের দাম ন্যায্য না থাকায় কৃষকদের মতো তিনিও কিছুটা চিন্তিত। এ ব্যাপারে কৃষি বিভাগের কিছু করার নেই।