কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বেরুবাড়ী ইউনিয়নের চরাঞ্চলে কৃষিকাজ মানেই ঝুঁকি। বিস্তীর্ণ চরে কাজ করতে গিয়ে কৃষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে থাকতে হয়। হঠাৎ ঝড়বৃষ্টি, বজ্রপাত—কোনোটারই পূর্বাভাস মেলে না। গত পাঁচ বছরে এই ইউনিয়নে বজ্রপাতে প্রাণ গেছে ৩ জনের, আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের ভয় আরও তীব্র হয়েছে। এমন বাস্তবতায় চর বলরামপুর এলাকায় একটি কৃষকছাউনি হয়ে উঠেছে নিরাপত্তা ও স্বস্তির নতুন ঠিকানা।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ছাউনির নিচে কয়েকজন কৃষক বসে গল্প করছেন। একজন বাঁশিতে সুর তুলেছেন। দুপুরের খাবার শেষে তাঁরা এখানে জিরিয়ে নিচ্ছেন। বলরামপুর, ফকিরটারী, চর টুপামারি ও গাছপাড়ি—বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা এসব কৃষকের জন্য এই ছাউনি এখন শুধু আশ্রয় নয়, কর্মদিবসের মাঝখানে একটু নিশ্চিন্ত বিরতি।
হেলভেটাস বাংলাদেশের সহযোগিতায় ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) সম্প্রতি চর বলরামপুরে এই কৃষকছাউনি স্থাপন করেছে। ছাউনির সঙ্গে বসানো হয়েছে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড, যাতে ঝড়বৃষ্টির সময় কৃষকেরা তুলনামূলক নিরাপদ থাকতে পারেন।
কৃষকছাউনির জন্য জমি দান করেছেন চর টুপামারি গ্রামের হাসানুর রহমান প্রধান। তিনি বলেন, ‘আগে কৃষকেরা মাঠে কাজ করতে এসে ঝড়বৃষ্টি শুরু হলে দিশেহারা হয়ে পড়ত। চারদিকে শুধু ফসলের জমি, আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা ছিল না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন বজ্রপাত, ঝড়—সবই বেড়েছে। ইএসডিও যখন এখানে জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে কাজ শুরু করে, তখন আমি কৃষকদের কথা ভেবে ছাউনি তৈরির জমি দিই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই ছাউনিটা শুধু একটা ঘর না, এটা কৃষকের জীবন রক্ষার একটা ব্যবস্থা। সরকার যদি বড় বড় চরে, যেখানে বসতবাড়ি দূরে, সেখানে এমন ছাউনি করে দেয়, তাহলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।’
কৃষক সমশের আলী (৪৮) বলেন, ‘এই ছাউনি হওয়ায় আমরা উপকার পাইছি।’
জলবায়ুঝুঁকির প্রভাব শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। নদীভাঙনে প্রতিবছর শত শত পরিবার ভূমিহীন হচ্ছে। বেরুবাড়ী ইউনিয়নের গাছপাড়ি গ্রামে দুধকুমার নদের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ৩০টি পরিবারকে নিয়ে ইএসডিও চালু করেছে জলবায়ু সহনশীল কৃষি উদ্যোগ। ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতিতে সরকারি রাস্তার দুই পাশে মালচিং পদ্ধতিতে লাউ, কুমড়া, শিম ও করলা চাষ হচ্ছে। রাস্তার ওপর মাচা তৈরি করে এই সবজি চাষে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন ভূমিহীন নারীরা।
এই দলের দলনেতা লাইজু বেগম (৩৫) বলেন, ভাঙনে সব হারিয়ে ফেলেছিলেন। এখন ৩০ জন নারী মিলে সবজি চাষ করছেন। পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কিছু বিক্রি করার আশা করছেন। ইএসডিও মাচা ও বীজের জন্য প্রতিটি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।
ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙন ও বজ্রপাত দুই ঝুঁকিই এখানে বেড়েছে। ভূমিহীন পরিবারকে সরকারি রাস্তার জমি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে তাঁরা তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
এ ছাড়া ইউনিয়নের যুবকদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে জলবায়ু অভিবাসন কেন্দ্র। কেন্দ্রের সম্পাদক কুমারী প্রিয়াংকা রানী বলেন, ‘আমরা নদীভাঙন ও জলবায়ুঝুঁকিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে ইউনিয়ন পরিষদ ও রেডিওকে দিই। এতে এসব পরিবার সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার আওতায় আসে।’ তিনি আরও বলেন, শুধু তালিকা করাই নয়, অভিবাসনের সময় কম ঝুঁকি থাকে, কোথায় গেলে নিরাপদ, কীভাবে পরিবারকে প্রস্তুত রাখতে হবে—এসব বিষয়েও মানুষকে সচেতন করা হয়।
কৃষিতে টেকসই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ওয়াপদা বাজারে চালু হয়েছে কমিউনিটি পর্যায়ের জলবায়ু তথ্যসেবা বীজভান্ডার ও জৈব প্রযুক্তি শিক্ষণকেন্দ্র। এখানে কৃষকদের বীজ সংরক্ষণ, জৈব সার ও প্রাকৃতিক কীটনাশক তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় কৃষি পরামর্শক আল আমিন বলেন, প্রতিদিন ২০-৩০ জন কৃষক এখানে পরামর্শ নিতে আসেন।
নাগেশ্বরী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. ফিরোজা হোসেন বলেন, ‘কৃষকছাউনি, মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষ ও জলবায়ু অভিযোজন কেন্দ্র—সবগুলোই সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে এসব কাজ আমাদের কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে করলে কৃষকেরা আরও বেশি উপকৃত হতো। আমরা পতিত জমি ব্যবহারে ও কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে নিয়মিত কাজ করছি।’