শাহজাহান চৌধুরী
শাহজাহান চৌধুরী

যে কারণে সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় জামায়াত বারবার জেতে

চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অবস্থা সব সময় শক্ত ছিল। এই আসনে নির্বাচনের এক বছর আগেই জামায়াতে ইসলামী নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করে। তিন তিনবার জামায়াতের প্রার্থী এখানে জয়লাভ করেন। অপর দিকে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনের এক মাস আগে। থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিএনপির কোনো কমিটি নেই। সাংগঠনিকভাবে জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী ছিল নতুন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও দুই দলের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা, নতুন প্রার্থী ও প্রচারণার জন্য শুধু এক মাস সময় পাওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। তবে মাত্র ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান বিএনপির প্রার্থী। নেতা–কর্মীরা বলছেন, বিএনপি আগে থেকে প্রার্থী নির্ধারণ করলে, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটিগুলো সক্রিয় থাকলে এই ব্যবধান কাটিয়ে উঠতে পারত।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী ১ লাখ ৭২ হাজার ৬১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন ১ লাখ ২৭ হাজার ২৫ ভোট পেয়েছেন।

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সে কারণে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জোটবদ্ধ নির্বাচন করলে সাতকানিয়া–লোহাগাড়া আসনটি জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরীকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বিষয়টি আলোচনায় ছিল।

জোটের আলোচনা থাকলেও জামায়াতে ইসলামী এই আসনে শাহজাহান চৌধুরীকে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে। তিনি এলাকায় নিয়মিত প্রচারণা শুরু করেন। এর আগে এই আসনে নির্বাচন করায় এলাকার প্রার্থী হিসেবেও পরিচিত তিনি। তাঁকে নতুন করে পরিচিত হতে হয়নি। শাহজাহান চৌধুরী ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী অলি আহমদের কাছে পরাজিত হন। ২০০১ সালে তাঁর দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও চট্টগ্রাম–১৪ আসনে উভয় দল পৃথকভাবে নির্বাচন করে এবং তাতে শাহজাহান চৌধুরী বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে এই আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম নির্বাচিত হন।

১৯৯১ সালের পর থেকে তিনবার জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়ার কারণে এই আসনে দলটির সাংগঠনিক অবস্থা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে ভালো। বিএনপি থেকে অলি আহমদ নির্বাচন করলেও তিনি ২০০৬ সালে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) নামের নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। নেতৃত্ব হারা হয়ে যায় সাতকানিয়া–লোহাগাড়া বিএনপি। বিএনপির কিছু নেতা–কর্মী অলির সঙ্গে যুক্ত হন। আর কিছু জামায়াতে ভিড়ে যান। বাকি যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।

২০০৮ সালের নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় বিএনপি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। আসনে নিজেদের কোনো প্রার্থী না থাকায় নেতা–কর্মীরা ছিলেন দোদুল্যমান। আসনটি কখনো জামায়াত, আবার কখনো এলডিপিকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে, সেই শঙ্কায় থাকতেন নেতা–কর্মীরা।

অপর দিকে আওয়ামী লীগের বাধার মুখে প্রকাশ্যে ও গোপনে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে গেছে জামায়াতে ইসলামী। এমনকি ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের মামলায় জামায়াতের দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসি দেওয়ার ঘটনায় সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় ব্যাপক সহিংসতা হয়। কিন্তু আন্দোলন–সংগ্রামে সেখানে বিএনপির কোনো ভূমিকা ছিল না।

এদিকে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদের গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়া–লোহাগাড়া আসনে। তাঁরাও শাহজাহানের জন্য প্রচারণায় নেমেছিলেন। পক্ষান্তরে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন, তা–ও স্পষ্ট ছিল না। উল্টো আসনটি বিএনপি তার জোটের শরিকদের ছেড়ে দিতে পারে, এমন আলোচনাও ছিল।

তবে এলাকাবাসী পাশে ছিলেন বলে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, এমনটাই মনে করেন জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সাতকানিয়া–লোহাগাড়াবাসীর সুখে–দুঃখে আছি আমি। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ১৭ বছরও জুলুম–নির্যাতনের শিকার লোকজনের পাশে ছিলাম। ৫ আগস্টের পর থেকে সশরীর তাদের পাশে ছিলাম। তাই লোকজন আমাকে বেছে নিয়েছেন। ভবিষ্যতেও আমি তাদের জন্য নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে করে যাব।’

জামায়াতে ইসলামীর আসন হিসেবে পরিচিত সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় ১ লাখ ২৭ হাজার ২৫ ভোট পেয়ে বিএনপি কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় বিএনপির কমিটি নেই। আমাদের প্রার্থী নির্ধারণও হয়েছিল এক মাস আগে। এটি জোটকে দেওয়া হতে পারে, এমন ধারণা ছিল সবার। এরপরও জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১ লাখ ২৭ হাজার ভোট পাওয়া কম নয়।’

হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘সাতকানিয়া–লোহাগাড়া বিএনপিকে শক্তিশালী করতে সাংগঠনিকভাবে যা যা করা দরকার, আমরা সব করব। এবারের নির্বাচন থেকে আমরা ঘাটতিগুলো কাটিয়ে উঠব।’