পেয়ারা পার্কের পাশে খালে পেয়ারার পসরা নিয়ে বসেছেন চাষিরা। সম্প্রতি পিরোজপুরের নেছারাবাদের ভিমরুলীর কাঠুরাকাঠি এলাকায়
পেয়ারা পার্কের পাশে খালে পেয়ারার পসরা নিয়ে বসেছেন চাষিরা। সম্প্রতি পিরোজপুরের নেছারাবাদের ভিমরুলীর কাঠুরাকাঠি এলাকায়

পিরোজপুরের নেছারাবাদ

পেয়ারার জনপদে টিকে থাকার লড়াইয়ে চাষিরা

খালের বুকজুড়ে তখন ছোট-বড় কয়েক শ নৌকা। কোনো নৌকায় শুধু পেয়ারা, কোনো নৌকায় লেবু, আবার কোথাও ডাব।

১১ জুলাই বৃহস্পতিবার, আষাঢ়ের এক সকাল। পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানা পৌঁছাতে পৌঁছাতেই আকাশের রং বদলে গেল। কুড়িয়ানা বাজারের দক্ষিণ দিকটায় পুরোনো বিশালকায় শিরীষগাছটি ডালপালা ছড়িয়ে এই জলপথের প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ছায়ায় নৌকার ঘাট। পাশে ছোট কোষা নৌকার বিশাল হাট বসেছে।

সরু খালগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মানুষের শরীরের শিরা-উপশিরা। সেই জলপথ বেয়ে কোষা নৌকা এগিয়ে চলে। দুই পাশে সারি সারি পেয়ারা, আমড়া, লেবু আর সবজির বাগান। গাছের ডাল পানির ওপর ঝুঁকে পড়েছে। কোথাও নৌকা বাগানের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে সরু পরিখা ধরে, কোথাও কৃষক ফল তুলছেন, কোথাও শিশু পানিতে ঝাঁপিয়ে খেলছে। প্রায় ৪০ মিনিট পর চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভীমরুলীর ভাসমান হাট।

খালের বুকজুড়ে তখন ছোট-বড় কয়েক শ নৌকা। কোনো নৌকায় শুধু পেয়ারা, কোনো নৌকায় লেবু, আবার কোথাও ডাব। নৌকার পর নৌকা পাশাপাশি ভিড়ে পানির ওপর তৈরি হয়েছে অস্থায়ী বাজার। হাঁকডাক নেই, তবু একধরনের ছন্দ আছে। দরদাম চলছে, ফল ওজন করা হচ্ছে, ট্রলারে মাল উঠছে। এই হাটের ইতিহাস প্রায় দুই শতাব্দীর। বরিশালের বানারীপাড়া, ঝালকাঠি সদর ও পিরোজপুরের নেছারাবাদজুড়ে গড়ে ওঠা দেশি পেয়ারার এই জনপদ একসময় শুধু ফলের জন্য নয়, জলপথনির্ভর জীবনযাত্রার জন্যও ছিল অনন্য।

আজও অন্তত ৫০ হাজার কৃষকের জীবন-জীবিকা এই পেয়ারা-আমড়া-লেবু ঘিরে। বানারীপাড়ার ১৬টি গ্রামে ৯৩৭ হেক্টর, ঝালকাঠির ১৩টি গ্রামে ৩৫০ হেক্টর এবং নেছারাবাদের ২৬টি গ্রামে ৬৪৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয় দেশি পেয়ারা।

চাষি শংকর ঢালীর বয়স ৪০ পেরিয়েছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ। পেয়ারা পার্কের পাশে কোষা নৌকার পাটাতনে পেয়ারা-লেবুর ডালা নিয়ে বিক্রি করতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই পেয়ারার ফলন খুব খারাপ। অতিরিক্ত গরমে ফুল, মুকুল, কচি পেয়ারা সব ঝরে গেছে। তাই ফলন কম হয়েছে। দামও কিছুটা কম। এখন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ। এখন আর চাষ করে টিকে থাকা দায়।’

আরেক কৃষক জাহিদ মিয়ার কথাতেও একই আক্ষেপ, ‘আগে পুরো বাগান পেয়ারার ছিল। এখন অনেক জায়গায় লেবু, আমড়া, মাল্টা লাগিয়েছি। শুধু পেয়ারা চাষ করে আর সংসার চলে না।’

এলাকার কয়েকজন চাষি বলেন, এ পরিবর্তন শুধু অর্থনীতির নয়, বদলে যাচ্ছে এ অঞ্চলের শত শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের ভূগোলও।

চাষিদের আক্ষেপ, দীর্ঘদিন ধরে পেয়ারা চাষ করেও তাঁরা পাননি সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাত শিল্প বা সহজ শর্তে ঋণের সুবিধা। তাই ফল দ্রুত পেকে নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে কম দামে তাঁদের বিক্রি করতে হয় উৎপাদিত পেয়ারা। এ ছাড়া সহজ শর্তে ঋণসুবিধা না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেকেই উচ্চ সুদে এনজিও থেকে ঋণ নেন। তাই লাভের বড় অংশ চলে যায় সুদ পরিশোধ করতে।

জলপথই জীবন

এ অঞ্চলে নৌকা শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, জীবনযাত্রারই অংশ। প্রায় প্রতিটি পরিবারের একটি বা একাধিক কোষা নৌকা আছে। এসব নৌকাতেই মানুষ বাজার করেন, বাগানে যান, ফল পরিবহন করেন, এমনকি সন্তানদের স্কুলেও পৌঁছে দেন।

দীর্ঘ খালের দুই পাশে সারি সারি পেয়ারা, আমড়া ও সবজির বাগান। বাগানের ভেতরে পানি চলাচলের জন্য খনন করা হয়েছে অসংখ্য সরু পরিখা। কৃষকেরা এসব ছোট নৌকা নিয়ে সেই পরিখায় ঢুকে গাছের পরিচর্যা করেন, ফল সংগ্রহ করেন।

ভেনিসের সঙ্গে তুলনা, তবু বাস্তবের সংগ্রাম

কুড়িয়ানা-ভীমরুলীর বিস্তীর্ণ খাল, জলপথ আর ভাসমান হাটের সৌন্দর্যের কারণে অনেকেই এ অঞ্চলকে বাংলাদেশের ভেনিস বলে থাকেন। বর্ষাকালে সেই সৌন্দর্য যেন পূর্ণতা পায়। ভীমরুলীতে রয়েছে চার থেকে পাঁচটি ভাসমান হোটেল, শতাধিক ট্রলার এবং ৩০টির বেশি পর্যটকবাহী নৌকা। কাছেই কাঠুরাকাঠির ১০ একরজুড়ে গড়ে উঠেছে ন্যাচারাল ট্যুরিজম অ্যান্ড পিকনিক স্পট। পাশের আদমকাঠিতে রয়েছে রিয়ান পেয়ারা পার্কসহ আরও কয়েকটি দর্শনীয় স্থান।

বিএম কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে ঘুরতে এসেছেন এখানে। পথে নৌকায় পাশাপাশি যেতে যেতে কথা হয়, তাঁদের একজন তনুশ্রী দত্তের সঙ্গে। তনুশ্রী বলেন, প্রতিবছর বর্ষাতেই তাঁরা বন্ধুরা মিলে এখানে আসেন। এখানে শুধু প্রকৃতি নয়, মানুষের সংগ্রাম আর জীবনযাত্রাও দেখার মতো।

ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন তালিমুল ইসলাম। নৌকায় ভাসতে ভাসতে তিনি বলেন, আগে ভিডিও ও ছবিতে এলাকাটির নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখেছি। কিন্তু এবার বাস্তবে দেখলাম, এক কথায় অসাধারণ। ছবির চেয়েও সুন্দর এলাকাটি।