পঞ্চগড়

২৬০ কোটি টাকার খড় বিক্রি, খুশি কৃষক 

প্রতি বিঘা জমির খড় গড়ে সাড়ে ৩ হাজার টাকা হলে ধানের সঙ্গে বাড়তি ২৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার খড় বিক্রি করবেন চাষিরা।

কৃষকের কাছ থেকে কেনা আমন ধানের খড় ভ্যানে করে খামারিদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা শহরসংলগ্ন বাইপাস মোড়ে
ছবি: প্রথম আলো

গেল মৌসুমে ১৮ বিঘা জমিতে আমন আবাদ করেছিলেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার কৃষক সাদ্দাম হোসেন। ধান মাড়াইয়ের পর তিনি ৮ বিঘা জমির খড় বিক্রি করেছেন ৩২ হাজার টাকায়। বাকি ১০ বিঘা জমির খড় নিজের পালিত গরুর খাবারের জন্য রেখেছেন। গত মৌসুমের চেয়ে এবার ধানের পাশাপাশি খড়ের বেশি দাম পেয়ে খুশি কৃষক সাদ্দাম।

শুধু সাদ্দামই নন, দেশের সর্বোত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের চাষিরা এবারের আমন মৌসুমে ধানের ভালো দাম পেয়েছেন। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খড়ের বাড়তি চাহিদা ও দাম। চাষিরা পরবর্তী ফসলের খরচ জোগাড়ে ধানের পাশাপাশি খড় বিক্রি করছেন।

কৃষি বিভাগের হিসাবমতে, পঞ্চগড়ে এবার ধানের সঙ্গে প্রায় ২২৪ কোটি টাকার খড় পেয়েছেন চাষিরা। গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত এ খড়ের দাম বর্ষাকালে আরও বাড়ার আশায় চাষিরা ধানের মতো খড় মজুত করছেন। বেশির ভাগ বড় চাষিদের বাড়িতে এখন খড়ের গাদা তৈরির ধুম পড়েছে। চাষিদের বাড়ি থেকে এসব খড় কিনে এনে শহরে প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া কিছু কিছু চাষির বাড়ি থেকে সরাসরি খামারিরা খড় কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গেল রোপা-আমন মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৩০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়। অর্থাৎ জেলায় ৭ লাখ ৪৭ হাজার ২২৪ বিঘা জমিতে ধানের চাষ হয়। বর্তমানে কৃষকেরা প্রতি মণ ধান ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। এ ছাড়া এক বিঘা জমির খড় বিক্রি হচ্ছে সাড়ে তিন–চার হাজার টাকা। প্রতি বিঘা জমির খড় গড়ে সাড়ে ৩ হাজার টাকা হলে ধানের সঙ্গে বাড়তি ২৬১ কোটি ৫২ লাখ ৮৪ হাজার ৩৫০ টাকার খড় বিক্রি করবেন চাষিরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. শাহ আলম মিয়া বলেন, পঞ্চগড়ে স্থানীয় স্বর্ণা জাতের ধানের চাষ বেশি হয়। স্বর্ণা ধানের খড় গরুর পছন্দের খাবার। এ ছাড়া দুই বছর ধরে ব্রি-৯৩ ধানের উৎপাদন বেড়েছে। এ ধানের খড় বেশি হয় এবং গোখাদ্য হিসেবে ভালো।

কৃষক, খড় ব্যবসায়ী ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পঞ্চগড়ে আমন ধানের দুই ধরনের খড় বিক্রি হয়। এর মধ্যে মাড়াইযন্ত্র দিয়ে ধান মাড়ানো খড়ের (একেবারে ভেঙে যাওয়া) হিসাব এক রকম। আর শ্রমিকদের মাধ্যমে হাতে মাড়ানো খড়ের (শক্ত থাকা খড়) হিসাব আরেক রকম। যন্ত্র দিয়ে মাড়ানো খড় বিঘা, ভ্যান বা গাদা হিসাবে বিক্রি হয়। অন্যদিকে হাতে মাড়ানো খড় আঁটি, ভার (২ আঁটি), পণ (৮০ আঁটি) বা কাহন (১৬ পণ) হিসাবে বিক্রি হয়ে থাকে।

কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, ভার হিসাবে প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ৬০ ভার এবং পণ হিসাবে প্রতি বিঘায় ১৫ পণ খড় পাওয়া যায়। এ ছাড়া মাড়াইযন্ত্রের ভেঙে যাওয়া খড় প্রতি বিঘায় দুই ভ্যান হয়ে থাকে। কৃষকদের বাড়ি থেকে বর্তমানে প্রতি ভার খড় ৫০ থেকে ৭০ টাকা, প্রতি পণ ৩০০–৩৫০ টাকা এবং ভেঙে যাওয়া খড় সাড়ে তিন–চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 

জেলা শহরের ধাক্কামারা এলাকায় করতোয়া সেতু-সংলগ্ন সড়কের পাশে খড়ের বাজার বসে প্রতিদিন। খড় ব্যবসায়ী হাচেন আলী বলেন, ‘এবার খড়ের চাহিদা কিছুটা বেশি। আমি কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি ভার খড় ৫০ টাকা দরে কিনেছি। এখানে সেই খড় প্রতি ভার ১০০ টাকায় বিক্রি করছি। এ ছাড়া বর্ষার সময় বিক্রির জন্য ৫০০ ভার খড় বাড়িতে গাদা করে রেখেছি। খড়ের এখনকার দাম দেখে মনে হচ্ছে, বর্ষায় এসব খড় ২০০ টাকা ভার হিসাবে বিক্রি হবে।’ 

এদিকে আমন মৌসুম শুরুর পর থেকে জেলা শহর ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলার সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত ভ্যান, ভটভটি ও ট্রাক্টরবোঝাই করে চাষিদের বাড়ি থেকে ব্যবসায়ীদের খড় কিনে আনতে দেখা গেছে। খামারিদেরও চাষিদের কাছ থেকে খড় কিনে খামারে নিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে।

বোদা উপজেলার চিড়াকুটি এলাকার কৃষক বশিরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, এবার খড়ের চাহিদা বেশি। খড়ের বাড়তি দাম কৃষকদের জন্য বোনাস।