ভোলার ৪ আসন 

শেষ মুহূর্তে আলোচনায় পার্থ, কয়েক মাস আগেই প্রার্থী ঘোষণা ও প্রচারণা জামায়াতের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রথম ধাপেই ভোলার চারটি সংসদীয় আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি। শেষ মূহূর্তে একটি আসন যুগপৎ আন্দোলনের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে ছেড়ে দিতে যাচ্ছে বিএনপি। এ নিয়ে জেলার রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থর ভোলা–১ আসন থেকে নির্বাচন করা নিয়ে প্রথম দিকে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। বিএনপির নেতা–কর্মীদের সঙ্গে তাঁর সমর্থক নেতা–কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষও হয়। পরে ঢাকা–১৭ আসনে আন্দালিভ রহমানের নির্বাচন করার কথা শোনা যাচ্ছিল। এ খবরে স্থানীয় বিএনপিতে স্বস্তি ফিরেছিল। শেষ পর্যন্ত ভোলা-১ আসনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন আন্দালিভ রহমান।

বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার আরও কয়েক মাস আগে প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ইসলামপন্থী দলগুলো। নির্বাচনী সমঝোতা হলে তাঁদের সঙ্গে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি আসনে প্রার্থী নিশ্চিত করেছে। 

ভোলা-১ (সদর)

২০০৮ সালে এ আসনে জোটের শরিক হিসেবে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন আন্দালিভ রহমান পার্থ। এবারও তিনি আসনটিতে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ আসনে প্রথম ধাপে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য গোলাম নবী আলমগীরকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

এর আগে আন্দালিভ রহমানের ঢাকা–১৭ আসনে প্রার্থী হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছিল। এ অবস্থায় আসনটিতে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা স্থগিত রেখেছিল বিএনপি। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি দেশে ফেরার পর ঢাকা-১৭ আসনের ভোটার হন তারেক রহমান। এর মধ্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা তাঁকে গুলশান-বনানী, বারিধারার মতো অভিজাত এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ আসন থেকে নির্বাচন করার জন্য অনুরোধ করেছেন। বিষয়টি জানার পর তারেক রহমানকে সম্মান জানিয়ে ভোলা-১ আসন থেকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আন্দালিভ রহমান। তিনি ভোলা-১ আসনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। একই সঙ্গে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।

বিজেপির ভোলা জেলার সাধারণ সম্পাদক মোতাসিম বিল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের দলীয় সিদ্ধান্ত, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ ভোলা-১ আসন থেকে গরুর গাড়ি প্রতীকে নির্বাচন করবেন।

গোলাম নবী আলমগীর বলেন, আন্দালিভ রহমান বিজেপির নাকি জোটের প্রার্থী— এ বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি শুধু এটুকুই জানেন, তাঁকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

এ আসনে জেলা জামায়াত আমির মো. নজরুল ইসলাম দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের ভোলা জেলা (উত্তর) শাখার সহসভাপতি মো. ওবায়েদুর রহমান, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মোহাম্মদ আশ্রাফ আলী, গণ অধিকার পরিষদের আইনুর রহমান জুয়েল মিয়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ওবায়দুর রহমান ও জাতীয় পার্টির মো. আকবর হোসাইন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

ভোলা-২ (বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান)

১৯৯১ সালের উপনির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোশারেফ হোসেন শাহজাহান। পরে ২০০১ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাফিজ ইব্রাহীম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবারও তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। হাফিজ ইব্রাহীম বলেন, ১৭ বছর জেল-জুলুম সহ্য করেও তিনি জনগণকে ছাড়েননি। নির্বাচিত হলে বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখানের ভাঙন প্রতিরোধ করবেন। গ্যাসভিত্তিক কলকারখানা নির্মাণ করে এলাকার বেকারত্ব দূর করবেন।

এখানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় গবেষণা ইউনিটের সদস্য ও জেলার সাবেক আমির মো. ফজলুল করিমকে প্রার্থী করেছে জামায়াত। তিনি বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে কাউকে কথায়–কথায় কমিশন দেওয়া লাগবে না। বরাদ্দের শতভাগ উন্নয়ন হবে। সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. আবদুস সালাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মোকফার উদ্দিন চৌধুরী, আমজনতার দলের মো. আলা উদ্দিন, জাতীয় পার্টির মো. জাহাঙ্গীর আলম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

১৯৮৬ সাল থেকে টানা ছয়বার এ আসনের সংসদ সদস্য হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি মন্ত্রী হয়েছেন একাধিকবার। এবারও তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

ভোলা-৩ (লালমোহন ও তজুমদ্দিন)

১৯৮৬ সাল থেকে টানা ছয়বার এ আসনের সংসদ সদস্য হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি মন্ত্রী হয়েছেন একাধিকবার। এবারও তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

আসনটি বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) মহাসচিব নিজামুল হক নাঈমকে ছাড় দিয়ে কোনো প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। ইসলামী আন্দোলনের মনোনয়ন পেয়েছেন ভোলা জেলার (দক্ষিণ) উপদেষ্টা মোসলেহউদ্দিন। তবে ইসলামি দলগুলোর সমঝোতা হলে বিএনপির হাফিজ উদ্দিনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন বিডিপির নিজামুল হক, এমনটাই মনে করছেন অনেক ভোটার।

লালমোহন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাফর ইকবাল বলেন, ‘মেজর (অব.) হাফিজের সঙ্গে যে দলই আসুক কেন, জনগণ তাঁকেই (হাফিজ) জয়ী করবে। তাঁর জনপ্রিয়তা মানুষের মণিকোঠায়। সেটি লড়াই করে হটানো সম্ভব নয়।’

আসনটিতে জাতীয় পার্টির মো. কামাল উদ্দিন ও গণ অধিকার পরিষদের মো. আবু তৈয়ব মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

ভোলা-৪ (চরফ্যাশন ও মনপুরা) 

১৯৯৬ সাল থেকে টানা তিনবার এখানে এমপি ছিলেন ডাকসুর সাবেক এজিএস ও বিএপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাজিম উদ্দিন আলম। ২০০৮ ও ২০১৮ সালেও তিনি বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তবে এবার যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম (নয়ন) বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন। এতে অসন্তুষ্ট হয়েছেন নাজিম উদ্দিনের অনুসারীরা।

নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার পর এলাকায় গিয়ে নেতা-কর্মীদের ডেকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছি। তাঁদের নয়ন বা নাজিম উদ্দিনের কর্মী না হয়ে বিএনপির কর্মী হয়ে কাজ করতে বলেছি। আমার সঙ্গে কারও দ্বন্দ্ব নেই।’

এ আসনে জামায়াতের বরিশাল অঞ্চলের টিম সদস্য মোহাম্মদ মোস্তফা কামালকে মনোনয়ন দিয়েছে দলটি। তিনি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে এখানে জামায়াত জয়ী হবে।

এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের মনোনয়ন পেয়েছেন কামাল হোসেন। জাতীয় পার্টি থেকে মো. মিজানুর রহমান, আমজনতার দল থেকে মো. জালাল উদ্দীন রুমী, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) থেকে আবুল কালাম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।