সড়কপথে কুতুবদিয়া থেকে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম যাওয়ার একমাত্র উপায় এ জেটি । জরাজীর্ণ এ জেটিতে ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করেন প্রায় এক লাখ মানুষ। সম্প্রতি তোলা
সড়কপথে কুতুবদিয়া থেকে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম যাওয়ার একমাত্র উপায় এ জেটি ।  জরাজীর্ণ এ জেটিতে  ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করেন প্রায় এক লাখ মানুষ। সম্প্রতি তোলা

জরাজীর্ণ মগনামা জেটি নিয়ে দুর্ভোগে দেড় লাখ বাসিন্দা

পাটাতনের ওপর পা রাখতেই যেন নড়ে ওঠে পুরো জেটি। কোথাও খসে পড়ছে সিমেন্ট-কংক্রিট, কোথাও বেরিয়ে আছে মরচে ধরা রড। এই ভাঙাচোরা কাঠামোর ওপর দিয়েই প্রতিদিন চলাচল করে হাজারো মানুষ। ট্রাকসহ নানা ধরনের যানবাহনে তোলা হয় পণ্য।

জরাজীর্ণ জেটিটি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামা এলাকায়। জেলার সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়া উপজেলায় যেতে এই জেটি থেকেই নৌযানে উঠতে হয়। এরপর পাড়ি দিতে হয় মগনামা-কুতুবদিয়া সাগর চ্যানেল।

কুতুবদিয়া উপজেলার বাসিন্দা প্রায় দেড় লাখ। বাসিন্দাদের নিয়মিত যাতায়াতের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মগনামা জেটি। কৃষকের উৎপাদিত ধান, জেলেদের শিকার করা মাছ এই জেটি হয়েই দেশের নানা স্থানে পাঠানো হয়।

পেকুয়া উপজেলা প্রশাসন জানায়, ২০০৫ সালের ১২ আগস্ট মগনামা জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই জেটি শুরু থেকেই পরিচালনা করছে কক্সবাজার জেলা পরিষদ।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মগনামা- কুতুবদিয়া চ্যানেলে ছোট-বড় নৌযানের চলাচল শুরু হয়। মগনামা জেটি হয়ে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করা হয় এসব নৌযানে। জেটিতে ঝুঁকি নিয়েই যাত্রীরা নৌযানে ওঠানামা করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে জেটিটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে থাকলেও তা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

পেকুয়া উপজেলা প্রশাসন জানায়, ২০০৫ সালের ১২ আগস্ট মগনামা জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই জেটি শুরু থেকেই পরিচালনা করছে কক্সবাজার জেলা পরিষদ।

সম্প্রতি সরেজমিনে জেটিতে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি স্থানে রেলিং ভেঙে গেছে। কোথাও পলেস্তারা ধসে রড বেরিয়ে পড়েছে। অন্তত ১০টি খুঁটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দুটি খুঁটির লোহাও ভেঙে গেছে। একাধিক সিঁড়ি মূল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অস্থায়ীভাবে কাঠের তক্তা বসিয়ে যাত্রী ও মালামাল ওঠানামা করানো হচ্ছে। এতে নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা ঝুঁকিতে পড়ছেন। অনেকেই অন্যের হাত আঁকড়ে ধরে ঘাট থেকে পাটাতনে উঠছেন।

কৃষিসহ ব্যবসার সকল পণ্য এ জেটি দিয়ে আনা নেওয়া করেন কুতুবদিয়ার বাসিন্দারা। সম্প্রতি তোলা

‘কখন যে ভেঙে পড়ে, বলা যায় না’

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া থেকে সড়কপথে চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারে যেতে হলে তাঁদের এই ঘাটই একমাত্র মাধ্যম। ঈদসহ নানান উৎসবে এ ঘাটে মানুষের চাপ অন্তত পাঁচ গুণ বাড়ে। বিশেষ করে কুতুবদিয়ায় মালেক শাহ (র.) দরবারের বার্ষিক ওরসের সময় জেটিতে পা রাখার জায়গা পাওয়া যায় না।

এ বছর ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি বার্ষিক ওরস হওয়ার কথা আছে। এতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের সমাগম ঘটতে পারে বলে ধারণা স্থানীয় বাসিন্দাদের। এত মানুষের চাপ জরাজীর্ণ এ জেটি কীভাবে সামাল দেবে, এ নিয়ে শঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় মাঝি আবুল হাশেম (৪৮) বলেন, ‘জেটি ভাঙা থাকায় নৌকা ভেড়াতে কষ্ট হয়। একটু অসাবধান হলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত সংস্কার না হলে একদিন বড় বিপদ হবে।’ একই কথা বলেন স্থানীয় জেলে বাদশা মিয়া (৫৮)। তিনি বলেন,‘এই ঘাটে দাঁড়িয়ে কত বছর মাছ নামিয়েছি। আজ নিজেরাই ভয় পাই। কখন যে ভেঙে পড়ে, বলা যায় না।’

কুতুবদিয়া উপজেলার বড়ঘোপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আ ন ম শহীদ উদ্দিন বলেন, মগনামা জেটি স্থানীয় মানুষদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ইতিমধ্যে কয়েকজন যাত্রী জেটি থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন।

জেটি ভাঙা থাকায় নৌকা ভেড়াতে কষ্ট হয়। একটু অসাবধান হলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত সংস্কার না হলে একদিন বড় বিপদ হবে।
আবুল হাশেম, স্থানীয় মাঝি।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত এ জেটির ইজারা হয়নি। আদালতের নির্দেশনায় ইজারার কার্যক্রম আপাতত স্থগিত। জানতে চাইলে সদ্য সাবেক ইজারাদার নুরুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি দল, জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদের প্রতিনিধিরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে জেটির কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম মাহবুব বলেন, ‘জেটি ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। মাছ পরিবহনে ব্যবহৃত বড় ট্রাক জেটির ভেতরের অংশে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। মন্ত্রণালয় ও জেলা পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।’

গুরুত্বপূর্ণ এ জেটি সংস্কার না হওয়া দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন পেকুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাওয়া দুঃখজনক। দ্রুত বরাদ্দ দিয়ে সংস্কার না করলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।