
দূর থেকে দেখলে মনে হবে পুরোনো একটি মাটির ঘর। বন্ধ জানালার পাশের দেয়ালে টাঙানো হয়েছে চিঠির বাক্স। কেবল বাক্সটি দেখে বোঝা যায়, এটি একটি ডাকঘর। মাটির ঘরটির চারটি দরজা। প্রথম দরজা খোলা। ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল, একটি টেবিলের দুই প্রান্তে দুজন বসে আছেন। জানা গেল, তাঁদের একজন মো. আমির হোসেন। তিনি পোস্টমাস্টার। ডাকসংক্রান্ত টুকটাক কাজ করছিলেন। তাঁর টেবিলে চিঠি মাপার পাল্লা, বিভিন্ন রকমের লোহার সিল, আঠা ও গালা। এটি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের তৈলার দ্বীপ ডাকঘর।
কথা বলতে বলতে আমির হোসেন জানালেন, এখন চিঠি তেমন একটা বাইরে যায় না, শুধু আসে। বাইরে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা চিঠির বাক্সও প্রতিদিন ১১টার সময় খোলা হয়। কিন্তু তাতে পাঠানোর জন্য কেউ চিঠি ফেলে না। এরপরও নিয়মিত বাক্স খোলা হয়।
আমির হোসেন বলেন, সেপ্টেম্বর মাসে ৩২৪টি চিঠি বা ডকুমেন্টস গ্রহণ করে বিতরণ করা হয়। তার মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করা চিঠি ছিল ৩০৩টি। ১ নভেম্বর এক দিনে চারটি চিঠি পেয়ে বিতরণ করা হয়। এসব চিঠির মধ্যে দুটি তৈলার দ্বীপ, একটি বারখাইন এবং অপর চিঠিটি শোলকাটা এলাকায় বিতরণ করেন পিয়ন মিজানুর রহমান। রানার হিসেবে আছেন আলী আকবর।
স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, এ ঘরটি একসময় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের পরিবারের কাছারিঘর ছিল। এখানে একসময় শিশুদের মক্তব পরিচালিত হতো। আরবি শেখানো হতো তাদের। বর্তমানে পাশের মসজিদে আরবি শেখে শিশুরা। ওই কাছারিঘরের তিনটি কক্ষ এখন তালা দেওয়া। আর অপর কক্ষে চলছে ডাকঘরের কার্যক্রম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বছরের পর বছর ধরে মাটির ঘরেই চলছে ডাকঘরের দাপ্তরিক কার্যক্রম। ২০১৭ সালে এটিসহ দেশের ৫ হাজার ৫০৬টি ডাকঘরকে পোস্ট ই-সেন্টার বা ডিজিটাল ডাকঘরে রূপান্তরিত করা হয়। পাকা ঘর না থাকায় ই-পোস্ট সেন্টার ঘোষণা হলেও ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া যন্ত্রপাতি পটিয়া ডাকঘরে রাখা হয়েছে। অথচ এটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডাকঘর বা পোস্ট ই-সেন্টারে রূপান্তরিত করা গেলে কম্পিউটার কম্পোজ, প্রিন্টিং, স্ক্যানিং, ছবি প্রিন্ট, ই-মেইল, ইন্টারনেটের মাধ্যমে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, দেশে-বিদেশে ভিডিও কনফারেন্স, আর্থিক সেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় ভাতাদান, ই-কমার্স, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সেবা পেত স্থানীয় লোকজন।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, একসময় ডাকঘরটি চিঠিপত্র পাঠানো ও গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। তবে মুঠোফোনের কারণে চিঠি আদানপ্রদান কমে গেছে। তবে ডাকঘরের আবেদন কমেনি।
পোস্টমাস্টার মো. আমির হোসেন বলেন, সপ্তাহের পাঁচ দিন তৈলার দ্বীপ ডাকঘরের আসা চিঠিপত্র আশপাশের পাঁচ-ছয় কিলোমিটার এলাকায় ডেলিভারি করা হয়। তবে স্থানীয় লোকজন ডাকঘর ব্যবহার করে আগের মতো চিঠিপত্র খুব একটা পাঠান না। আদালতের নোটিশ, তালাকনামা, সরকারি চাকরির কাগজপত্র শুধু নিয়মিত আসে।
জানতে চাইলে ডাক বিভাগের আঞ্চলিক পরিদর্শক (পটিয়া) রাজীব দাশ বলেন, ‘তৈলার দ্বীপ ডাকঘরের নিজস্ব ভবন ও জায়গা না থাকায় মাটির ঘরে আমাদের দাপ্তরিক কাজ চালাতে হচ্ছে। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী পাওয়া তথ্যপ্রযুক্তি ডিভাইসগুলো নিরাপত্তার অভাবে সেখানে রাখা হয়নি।’