
নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে আরও ৩০ দিনের সময় চেয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। আদালত আবেদন মঞ্জুর করেছেন। আজ রোববার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ নুরুল হুদা চৌধুরীর আদালতে সশরীর হাজির হয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দীপক চন্দ্র মজুমদার সময় বাড়ানোর আবেদন করেন।
নারায়ণগঞ্জ আদালত পুলিশের পরিদর্শক মো. আবদুস সামাদ বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সশরীর হাজির হয়ে ব্যাখ্যা তলব করেছিলেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা হাজির হয়ে প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে আরও ৩০ দিনের সময় প্রার্থনা করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।
এর আগে গত ৮ জানুয়ারি তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগপত্র দাখিলে সময় চাইলে আদালত ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা আবার সময় চেয়ে লিখিতভাবে আবেদন করেন। ওই আবেদনের ওপর শুনানি শেষে গত ৫ মার্চ আদালত তদন্ত প্রতিবেদনসহ আজ ২৬ এপ্রিল তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সশরীর আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আজ ধার্য তারিখে মামলার সাত আসামি আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। তাঁরা হলেন আজমেরী ওসমানের সহযোগী ইউসুফ হোসেন, ইয়ার মোহাম্মদ পারভেজ, মামুন মিয়া, কাজল হাওলাদার, আব্দুল্লাহ্ আল মামুন, সাফায়েত হোসেন শিপন ও রিফাত বিন ওসমান। পলাতক ছিলেন সুলতান শওকত ও সালেহ রহমান। আদালতে শুনানিতে অংশ নেন বাদীপক্ষের আইনজীবী প্রদীপ ঘোষ, আওলাদ হোসেন, জিয়াউল ইসলাম প্রমুখ।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী প্রদীপ ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে সশরীর হাজির হয়ে তদন্তের অগ্রগতি ও অভিযোগপত্র দাখিলে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে কমপক্ষে ৩০ দিনের সময় বাড়ানোর আবেদন করেন, যা আদালত মঞ্জুর করেছেন। আবেদনে তদন্তসংক্রান্ত বিষয়ে প্রধান কার্যালয় থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মতামত এখনো পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা লিখিত আবেদনে উল্লেখ করেছেন, মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মতামত চেয়ে সাক্ষ্যের স্মারকলিপি দাখিল করা হয়েছে। সাক্ষ্যের স্মারকলিপির আদেশ পাওয়া গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে। তাই মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে কমপক্ষে ৩০ দিনের সময়ের প্রয়োজন।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ নগরের শায়েস্তা খাঁ সড়কের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। এর দুদিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রমর ও ইউসুফ হোসেনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব–১১। এর মধ্যে সুলতান শওকত ভ্রমর ও ইউসুফ হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে সুলতান শওকত জানান, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
২০১৪ সালের ৫ মার্চ তদন্তকারী সংস্থা র্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে তাদেরই টর্চার সেলে আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছেন। অচিরেই তারা অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করবে। কিন্তু সেই অভিযোগপত্র আজও আদালতে পেশ করা হয়নি। সুলতান শওকত ভ্রমরের পর আজমেরী ওসমানের সহযোগী কাজল হাওলাদার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে টর্চার সেলে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে।
ত্বকী হত্যাকাণ্ডের পর থেকে প্রতি মাসের ৮ তারিখে ঘাতকদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করে আসছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে দীর্ঘ সাড়ে ১১ বছর পর ত্বকী হত্যা মামলার বিচারের উদ্যোগ নিলেও অন্তর্বর্তী সরকারও প্রতিবেদন দিতে পারেনি।