কলকাতায় হোটেলে আগুনে নিহত আলিমুজ্জামান সাজুর লাশের জন্য বাড়ির সামনে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। আজ শুক্রবার সকালে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের বরেয়া গ্রামে
কলকাতায় হোটেলে আগুনে নিহত আলিমুজ্জামান সাজুর লাশের জন্য বাড়ির সামনে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। আজ শুক্রবার সকালে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের বরেয়া গ্রামে

কলকাতার হোটেলে আগুন : ‘অপেক্ষা করছি, কখন মরদেহ বুঝে পাব’

কয়েক দিন আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা (চেকআপ) করাতে ভারতে গিয়েছিলেন আলিমুজ্জামান সাজু। গত বুধবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে স্বজনেরা খবর পান, কলকাতার একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন তিনি। তাঁর মরদেহের অপেক্ষায় আজ শুক্রবার সকালেও সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের বরেয়া গ্রামে বাড়ির সামনে বসে ছিলেন বড় ভাই সাহেব সরদার। পাশে স্বজন ও প্রতিবেশীরা। কেউ নির্বাক বসে, কেউ সাজুর স্মৃতিচারণা করছিলেন।

আক্ষেপ করে সাহেব সরদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন দূরে বসে ওর মরদেহ পাওয়ার অপেক্ষা করা ছাড়া আমার আর কী করার আছে? অপেক্ষা করছি, কখন মরদেহ বুঝে পাব।’

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নয়জনের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশের নাগরিক। তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

এ সম্পর্কে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কর্মকর্তা ওমর ফারুক আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আজই পাঠানোর চেষ্টা করছি। তবে এখনো সব কাগজপত্রের কাজ শেষ হয়েছে কি না, নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। হয়ে যাওয়া মাত্র আমরা পরিবারকে জানিয়ে দেব।’

মরদেহ পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওমর ফারুক আকন্দ বলেন, ‘মরদেহ এখন মর্গে আছে। আমাদের এখান থেকে একটি এনওসি এবং ভারতের ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) থেকে আরেকটি এনওসি প্রয়োজন। এ জন্য ঘটনাস্থলের থানার একটি জিডির কপি প্রয়োজন। সেই জিডির কপি এখনো আমরা হাতে পাইনি। সেটি পেয়ে গেলে আমাদের এনওসি ইস্যু করা সম্ভব হবে। এ কারণে একটু দেরি হচ্ছে।’

কলকাতায় হোটেলে আগুনে নিহত রেবতী সরকারের ঘরের দরজায় ঝুলছে তালা

আজ সকালে সাজুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। বড় ভাই সাহেব সরদার মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের হটলাইনে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছেন, আজ মরদেহ হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে। তবে নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে উপহাইকমিশনের জরুরি বৈঠকে শনিবারের মধ্যে মরদেহ দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সাজুর ছোটবেলার বন্ধু ও সহপাঠী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডাক্তার দেখাতে কলকাতায় গিয়ে সে মারা গেল—এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আমাদের অনুরোধ, সাজুর মরদেহ যেন দ্রুত দেশে আনা হয়।’

এদিকে একই অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাতক্ষীরার আরেক বাসিন্দা রেবতী সরকারের বাড়ি তারালী ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামে। শুক্রবার সকালে তাঁর বাড়িতে তালা ঝুলছিল। প্রতিবেশী স্বজন তপন সরকার জানান, রেবতীর স্বামী ভবেশ সরকার ঢাকায় এবং তাঁদের দুই সন্তান অনিক ও ত্রিশা ভারতে থাকায় বাড়িটি তালাবদ্ধ।

তপন সরকার বলেন, আজ সকালে রেবতীর ছেলে অনিকের সঙ্গে তাঁর মুঠোফোনে কথা হয়েছে। অনিক ভারতের উত্তরাখন্ডে ছিলেন। সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতায় আসছেন। পুলিশ তাঁকে জানিয়েছে, তাঁর মায়ের মরদেহ কলকাতার মর্গে আছে।
তপন বলেন, ‘আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তোর মায়ের মরদেহ কী করবি?”

অনিক বলেছে, সেখানে যদি কোনো আইনি জটিলতা না থাকে, তাহলে তারা ভারতেই মায়ের সৎকার করতে চায়। আর আইনগত কারণে তা সম্ভব না হলে মরদেহ দেশে নিয়ে আসবে।’

রেবতীর পরিবার চাইলে ভারতে তাঁর সৎকার করতে পারবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কর্মকর্তা ওমর ফারুক আকন্দ। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে কোনো আইনি জটিলতা নেই।

অগ্নিকাণ্ডে পাসপোর্ট পুড়ে বা নষ্ট হয়ে যাওয়া বাংলাদেশিদের দেশে ফেরার জন্য বিশেষ ট্রাভেল পারমিটের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান ওমর ফারুক আকন্দ।

‘শিখা ইন’ হোটেলে নিহত সাত বাংলাদেশির মধ্যে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের রেবতী সরকার ও এস এম আলিমুজ্জামান সাজু রয়েছেন। বাকি পাঁচজনের মধ্যে চারজন কুষ্টিয়ার এবং একজন ঢাকার সাভারের বাসিন্দা। নিহত দুই ভারতীয় নাগরিক সন্দ্বীপ পাসোয়ান ও যোগ নারায়ণ আগরওয়ালের মরদেহ গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।