
যূথিকা ত্রিপুরার (৪১) দিনটা শুরুই হয় পানির ভাবনায়। ভোর না হতেই কলসি নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন পাহাড়ি পথ ধরে। দুটি পাহাড় ডিঙিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে তিনি যান গ্রামের শেষ সীমানায় থাকা একটি কুয়ার কাছে। এরপর কুয়া থেকে কলসিতে পানি নিয়ে ফেরেন ঘরে।
যূথিকা ত্রিপুরার বাড়ি পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম বিষ্ণু কার্বারিপাড়ায়। তাঁর মতো এভাবেই পানির জন্য প্রতিদিন দুই থেকে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় পাড়ার বাসিন্দাদের। কুয়াটির পানির ওপর নির্ভরশীল গ্রামের সাত শতাধিক পরিবার।
এলাকাটি পাথুরে হওয়ায় সাধারণ নলকূপ বসালে পানি আসে না। আমি বিভিন্ন জায়গায় পানির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য বলি, কিন্তু কেউ একটি গভীর নলকূপের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে না।ভুবনজয় ত্রিপুরা, সদস্য, মেরুং ইউনিয়ন পরিষদ।
সম্প্রতি বিষ্ণু কার্বারিপাড়ায় গিয়ে কথা হয় যূথিকা ত্রিপুরার সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতিদিন তিন থেকে চারবার তাঁকে পানির জন্য যেতে হয়। পাহাড়ি পথ বেয়ে যাওয়া-আসা করতে করতে দিনের অনেকটা সময়ই চলে যায়। সকালে পানি আনতে গিয়ে ফিরতে ফিরতে বেলা হয়ে যায়। যূথিকা বলেন, শুষ্ক মৌসুমে কুয়া শুকিয়ে যায় আর বৃষ্টি হলে নোংরা ও ঘোলাটে হয়ে যায় পানি। তখন ব্যবহারের উপযোগী সামান্য পানি নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় কুয়ার পাড়ে অপেক্ষা করতে হয়। সারা দিন কুয়ার পাশে মানুষের ভিড় থাকে। তাই অনেক নারী সন্ধ্যার পর হারিকেন বা কুপির আলো জ্বালিয়ে পানি সংগ্রহ করতে যান।
গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে বাড়ি রঞ্জন বিকাশ ত্রিপুরার। তাঁর বাড়ি থেকে কুয়াটির দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। পানির জন্য কুয়ায় যেতে সময় লাগে আধঘণ্টার বেশি। তিনি বলেন, পানির কষ্ট দূর করতে অনেকেই কুয়ার পাড়ে ঘর করছেন। তাঁর বাড়ির পাশের বেশ কয়েকটি পরিবারও কুয়ায় আশপাশে জায়গা কিনে ঘর করেছেন। পানির সংকট দেখা দিলে তাঁরও মাঝেমধ্যে ইচ্ছা হয় কুয়ার পাড়ে গিয়ে ঘর করতে। রঞ্জন বিকাশ বলেন, ‘বাপ–দাদার ভিটেবাড়ি ফেলে যেতে কষ্ট লাগে। আবার পানির জন্য কুয়ার আশপাশে জায়গা কিনে ঘর করলেও জুমচাষ এবং বাগানে কাজ করার জন্য পুরোনো ভিটায় প্রতিদিন আসতে হবে। সেটিও কষ্টের। তাই কুয়ার পাড়ে ঘর করা হয়ে ওঠে না।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সারা বছরই এলাকায় পানির সংকট লেগে থাকে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে এলাকার মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। পাড়ায় একটি গভীর নলকূপ বা রিংওয়েল স্থাপন করা গলে এই সমস্যা থাকত না।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ভুবনজয় ত্রিপুরা বলেন, ভোর থেকে রাত ৯-১০টা পর্যন্ত নারীরা পানির জন্য কষ্ট করেন। সকালে আলো ফোটার পর নারীদের লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। তিনি আরও বলেন, ‘এলাকাটি পাথুরে হওয়ায় সাধারণ নলকূপ বসালে পানি আসে না। আমি বিভিন্ন জায়গায় পানির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য বলি, কিন্তু কেউ একটি গভীর নলকূপের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে না।’
খাগড়াছড়ি সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) রতন খীসা বলেন, ‘কুয়ার পানি অবশ্যই ফুটিয়ে পান করা উচিত। কুয়ার পানি খেলে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ হওয়ার শঙ্কা থাকে। যদিও সচেতনতার অভাবে পাহাড়ের লোকজন কুয়ার পানি ফুটিয়ে খেতে চাই না।’
দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ বলেন, ‘উপজেলার কয়েকটি দুর্গম পাড়ায় সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। বিভিন্ন পাড়া থেকে আবেদন পাওয়া গেছে। গত বছর বাজেট না থাকায় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এ বছর বাজেট পেলে যেসব পাড়ায় টিউবওয়েল নেই, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’