প্রকল্পের অনিয়ম–দুর্নীতি নিয়ে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

দারিদ্র্য দূরীকরণে গাইবান্ধায় বাস্তবায়িত প্রায় ৫১ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১৮ হাজার ৬০০ জনের তালিকা প্রকল্পের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁদের অনেকেই প্রশিক্ষণের কথা জানেন না। এমনকি প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ভাতা কেটে নেওয়া, ভাতা ও ঋণ প্রদানে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া ঋণ নিয়ে কাজে সফল হননি অনেক সুবিধাভোগী। এখন তাঁরা হাত গুটিয়ে বসে আছেন।
সম্প্রতি ওই প্রকল্পের অনিয়ম–দুর্নীতি নিয়ে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তবে প্রকল্প পরিচালক দাবি করেন, প্রকল্পের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। মানুষ উপকৃত হয়েছেন।
গাইবান্ধা পল্লী উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ‘গাইবান্ধা সমন্বিত পল্লী দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি’ নামের প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল সাড়ে পাঁচ বছর। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে প্রথমে ৪১ কোটি ৭৭ লাখ ৭৩ হাজার টাকা এবং ২০২১ সালের জুলাই মাসে আরও ৯ কোটি ১৬ লাখ ২৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। মোট বরাদ্দ ৫০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রশিক্ষণের জন্য ১৬ কোটি ২০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। এ টাকা দিয়ে ১৮ হাজার ৬০০ জন দরিদ্র নারী–পুরুষকে এমব্রয়ডারি, বাঁশ ও কাঠশিল্প, হাঁস-মুরগি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, দুগ্ধ খামার, নার্সারি, মৃৎশিল্প, মোবাইল সার্ভিসিং, গ্রামীণ ইলেকট্রনিকস দোকান, হোসিয়ারি ও কাপড়ের ব্যাগ তৈরি বিষয়ে ৮ দিন থেকে ১ মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে ৬ হাজার ৫০০ থেকে ১৯ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে ১৩ হাজার জনকে ২০-৩০ হাজার টাকা করে মোট ২৬ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়।
প্রকল্পে ২৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী সার্বিক কাজের তদারকি করেন। ব্যবস্থাপনা, বেতন–ভাতা বাবদ ৮ কোটি ৭০ লাখ ১২ হাজার টাকা দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ১৮ হাজার ৬০০ জন প্রশিক্ষণার্থীর নাম আছে। এর মধ্যে অনেক নারী-পুরুষই প্রশিক্ষণ পাননি। শুধু তা–ই নয়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৫ হাজার ৬০০ জনকে কোনো ঋণ দেওয়া হয়নি।
প্রকল্পের তালিকাভুক্ত অন্তত ৮০ জনের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। গাইবান্ধা সদর উপজেলার জগতরায় গ্রামের সুমি বেগম (৩৬) বলেন, ‘প্রশিক্ষণ নেওয়া দূরের কথা, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’ একই মন্তব্য করেন সাদুল্যাপুর উপজেলার বড় জামালপুর গ্রামের সেলি বেগম (৪১)।
সদর উপজেলার গোপালপুর গ্রামের ছবি আক্তার (৩৫) বলেন, ‘প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আমার কাছে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে।’ একই অভিযোগ করেন পার্শ্ববর্তী ভগবানপুর গ্রামের রুমি বেগম (৩০), কল্পনা রানী (৪০) ও রাশেদা বেগম (৩৮)।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর গ্রামের ফরিদুল ইসলাম (৪৫) বলেন, তিনি এক মাসের প্রশিক্ষণ নেন। ভাতা পাওয়ার কথা ১৯ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু তাঁকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে চেকে সই নেওয়া হয়। একই অভিযোগ করেন একই উপজেলার সিংজানি গ্রামের আবদুল হালিম (৪৪), নুরুল আমিনসহ (৫০) অনেকে।
এদিকে দারিদ্র্য দূরীকরণে ঋণ বিতরণ করা হলেও সেই ঋণ কোনো কাজে লাগেনি। ঋণগ্রহীতারা পাঁচ থেকে ছয় মাস ব্যবসা করেন। এরপর বাজারজাত সমস্যা ও প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। তাঁদের অনেকেই এখন হাত গুটিয়ে বসে আছেন। সাঘাটা উপজেলার শিমুলতাইর গ্রামের শাহীন মিয়া (৩৭) বলেন, ‘আমি বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি। কাজের জন্য যন্ত্রপাতি কিনতে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিই। ঋণ নিতেও এক হাজার টাকা দিতে হয়েছে। কিছুদিন ভালোভাবে ব্যবসা চলেছে। এরপর লোকসান হওয়ায় বর্তমানে বেকার হয়ে আছি।’
ফুলছড়ি উপজেলার উত্তরকাঠুর গ্রামের সাইদা বেগম (২৮) দর্জি কাজের জন্য ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কয়েক মাস তাঁর ব্যবসা ভালো চলেছে। বাজারে চাহিদা না থাকায় এবং মূলধনের অভাবে তাঁর ব্যবসা বন্ধ আছে। ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন একই গ্রামের রমনা আক্তার (৩০)। তিনি বলেন, ‘ঋণের টাকায় সেলাই মেশিন কিনি। কিছুদিন ব্যবসা ভালো চলে। এরপর মেশিনটি নষ্ট হয়ে যায়। টাকার অভাবে সেটি মেরামত করতে পারিনি। ঋণের টাকার জন্য অফিস থেকে চাপ দিচ্ছে।’
এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন গাইবান্ধা সমন্বিত পল্লী দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবদুস সবুর। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ওয়েবসাইটে যাঁদের নাম আছে, তাঁরা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ না দিয়ে তালিকায় কারও নাম ওঠেনি। তবে কিছু প্রশিক্ষণার্থীর মুঠোফোন নম্বর ভুল হয়েছে।
আবদুস সবুর আরও বলেন, প্রশিক্ষণের কথা বলে টাকা নেওয়া ও প্রশিক্ষণ ভাতার টাকা কেটে নেওয়া বা চেকে সই গ্রহণের অভিযোগ সঠিক নয়। ঋণ দেওয়ার জন্য টাকা নেওয়া হয়নি। শতকরা ৯০ ভাগ ঋণের টাকা আদায় হয়েছে।