
কপোতাক্ষ নদের পাড় ঘেঁষে কাশির হাটখোলায় ছোট্ট একটি মিষ্টির দোকান। কাচের বাক্সে সারি সারি সাজানো রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম, গজা। সামনে আরেকটি বাক্সে পেঁয়াজু ও শিঙাড়া। দোকানের এক পাশে খেলছে তিন শিশু। আর ভেতরে মিষ্টির পাত্র গুছিয়ে রাখছেন এক নারী। তাঁর নাম হিরা মণ্ডল (৩০)। ব্যবসা কেমন চলছে—জানতে চাইলে মৃদু হেসে তিনি বলেন, ‘এই তো ব্যবসা চলতিছে কোনো রকমে। অনেক কষ্ট কইরে আবার দোকানডা দাঁড় করাইছি। এখন নতুন করে শুরু করছি সব।’
বৃহস্পতিবার সকালে দোকানে বসেই নিজের জীবনের গল্প বলছিলেন হিরা মণ্ডল। কখনো পাত্র গোছাচ্ছেন, কখনো সন্তানদের দিকে নজর রাখছেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে ফিরে যাচ্ছিলেন ছয় বছর আগের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিতে।
হিরা মণ্ডলের এই নতুন করে শুরু করা কেবল একটি দোকান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কপোতাক্ষ নদের ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব, ভিটেমাটি হারানোর বেদনা এবং এক নারীর টিকে থাকার লড়াই। খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের কাশির হাটখোলা একসময় ছিল নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। কপোতাক্ষ নদ দিয়ে ধোলাই নৌকায় করে দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীরা আসতেন। প্রতি মঙ্গলবার বসত জমজমাট হাট। এই হাটের নদী ঘেঁষা অংশেই ছিল হিরা মণ্ডল ও তাঁর স্বামী বিশ্বজিৎ মণ্ডলের ছোট্ট মিষ্টির দোকান এবং বসতভিটা। সাধারণ মিষ্টি ও ডাল-ভাত বিক্রি করেই চলত সংসার। স্বপ্ন ছিল একদিন দোকান বড় হবে ছানার রসগোল্লা, সন্দেশ, চমচমসহ নানা মিষ্টি তৈরি হবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের মাঝখানে দাঁড়ায় কপোতাক্ষ। ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পান আঘাত হানে উপকূলে। দুপুরের পর থেকেই শুরু হয় প্রবল বাতাস। মুহূর্তের মধ্যে উড়ে যায় ঘরের টিনের চাল, দোকানের বেড়া। এরপর নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় তাঁদের দোকান ও বসতভিটা।
হিরা মণ্ডল বলেন, ‘চোখের সামনে সব শেষ হইয়ে গেল। কিছুই বাঁচাতি পারিনি। মেয়েডারে নিয়ে শুধু প্রাণটা নিয়ে পালাইছিলাম।’
সেদিন তাঁদের বড় মেয়ে পূজার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে তাঁরা আশ্রয় নেন কাশির হাটখোলা বেড়িবাঁধের উঁচু অংশে। সেখানে আরও অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয় নেয়। বাঁধের ওপর তাঁবু খাটিয়ে শুরু হয় এক অনিশ্চিত জীবন। একই জায়গায় খাওয়া, ঘুম, রান্না—সবকিছু। বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে শুকিয়ে চলত দিন।
হিরা বলেন, ‘কপোতাক্ষ শুধু ঘর নেইনি, জমিও নেগেছে। ফেরার মতোন কোনো জায়গা আর ছিল না।’
দীর্ঘ সময় বাঁধে কাটানোর পর বাধ্য হয়ে বাঁধসংলগ্ন খাসজমিতে ঘর তোলেন তাঁরা। কিন্তু নতুন ঘরেও জীবিকার নিশ্চয়তা ছিল না। সংসার চালাতে হিরা নেমে পড়েন নোনাপানিতে। নেট দিয়ে বাগদার পোনা ধরতেন তিনি, স্বামী চালাতেন ভ্যানগাড়ি।
সব হারানোর পরও স্বপ্ন ছাড়েননি হিরা। বরং নতুন করে মিষ্টির ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সমস্যা ছিল, তিনি শুধু সাধারণ মিষ্টি বানাতে জানতেন; ছানার মিষ্টি বানাতে জানতেন না। কাজ শেখার জন্য একদিন পাশের এলাকার একজন প্রবীণ মিষ্টি কারিগরের কাছে যান। হিরার ভাষায়, ‘আমি যাইয়ে বললাম, দাদু, আমি একটু মিষ্টি বানানি শেখপো। উনি বললেন, টাকা কিন্তু দিতি পারব না। আমি বললাম, আমার টাকা লাগবি না, শুধু কাজ শিখাই দেন। তারপর ওনার কাছ থেইকে রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম বানানি শিখিছি।’
সেই শেখা হাতেই এখন নতুন করে তৈরি হচ্ছে সংসারের স্বপ্ন। গত বছর আবার একটি মিষ্টির দোকান গড়ে তুলেছেন তাঁরা। এ জন্য ৬০ হাজার টাকা ঋণ নেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে। এখনো প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। হিরা বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রী মিলি দোকান চালাতিছি। যেদিন বিক্রি কম হয়, সেদিন আবার গাঙে নামতি হয়। স্বামীও মাঝেমধ্যি দিনমজুরি করে। বসে থাকলি চলে না।’
এর মধ্যেই নতুন দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে হিরার অসুস্থতা। তাঁর বুকে টিউমার ধরা পড়েছে। খুলনায় চিকিৎসা করালেও আবার ব্যথা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ওষুধ শেষ হইয়ে গেছে। আবার ডাক্তার দেখাতি হবে।’
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা এখন তাঁদের জমি নিয়ে। যে খাসজমিতে ঘর ও দোকান তোলা হয়েছে, সেটি সরকারি জমি। হিরা বলেন, ‘ভয় লাগে। যদি আবার ঘর সরাতি বলে। আমাগের তো আর কোনো জায়গা নাই।’
সব দুঃখ-কষ্টের মাঝেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েই ভাবেন হিরা। তিনি বলেন, ‘আমার একটাই স্বপ্ন ছেলেমেয়েগুলারে লেখাপড়া শিখাইতে চাই। ওরা যেন আমাগের মতো কষ্ট না করে।’
তবে এই দীর্ঘ জীবনসংগ্রামে মানুষের ভালোবাসাই হিরার সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘মেয়ের জন্মের সময় ডাক্তার বলিছিল সিজার লাগবে। তখন এলাকার হিন্দু-মুসলমান সবাই এগিয়ে আইসে সাহায্য করিছে।’
বেদকাশী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক মিহির কান্তি মণ্ডল বলেন, কপোতাক্ষ হিরা মণ্ডলের ভিটেমাটি কেড়ে নিয়েছে, ভেঙে দিয়েছে স্বপ্ন। তবু তিনি থেমে যাননি। কাশির হাটখোলার ছোট্ট মিষ্টির দোকানটি তাই এখন শুধু জীবিকার জায়গা নয়; এটি হয়ে উঠেছে নদীভাঙন আর দুর্যোগে সব হারিয়েও মাথা তুলে দাঁড়ানোর এক নারীর সংগ্রামের প্রতীক।