মানিকগঞ্জ সদরে নির্মাণাধীন সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ বন্ধ থাকায় নতুন সেতু কাজে আসছে না। গত শনিবার দুপুরে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড-বাংলাদেশ হাট সড়কের জয়রা এলাকায়
মানিকগঞ্জ সদরে নির্মাণাধীন সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ বন্ধ থাকায় নতুন সেতু কাজে আসছে না। গত শনিবার দুপুরে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড-বাংলাদেশ হাট সড়কের জয়রা এলাকায়

মানিকগঞ্জে অধিগ্রহণ জটিলতায় সেতুর সংযোগ সড়কের কাজ বন্ধ

১৯৮৮ সালের বন্যায় মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড-বাংলাদেশ হাট সড়কের জয়রা এলাকায় মাটি সরে গিয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়।

মানিকগঞ্জ সদরের জয়রা এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ শেষ হলেও জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় বন্ধ রয়েছে সংযোগ (অ্যাপ্রোচ) সড়কের কাজ। এতে সেতুটি দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে না পারায় ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালের বন্যায় মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড-বাংলাদেশ হাট সড়কের জয়রা এলাকায় মাটি সরে গিয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়। পরে ওই সড়কে যানবাহন ও পথচারী চলাচলের জন্য একটি সেতু নির্মাণ করা হয়। আস্তে আস্তে সড়কটিতে যানবাহন ও পথচারীর সংখ্যা বেড়েছে। এ ছাড়া সেতুর উত্তর পাশে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। এসব কারণে সরু ওই সেতু দিয়ে পারাপার হতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিন দুই পাশে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে রোগী ও তাঁদের স্বজনসহ হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে পুরোনো ওই সেতুর পশ্চিম পাশে নতুন আরেকটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। নতুন সেতুর কাজ শেষ হলেও জমির মালিকের বাধায় দুই পাশে সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয় লোকজন বলেন, জেলার দৌলতপুর, সাটুরিয়া উপজেলাসহ টাঙ্গাইলের নাগরপুরের হাজার হাজার লোক ও শত শত যানবাহন পুরোনো সরু সেতু দিয়ে চলাচল করছে। এতে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সেতুর দুই পাশে দীর্ঘ সারিতে আটকে থেকে সেতু পারাপার হতে হয়। এ ছাড়া সেতুর উত্তর পাশে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে। প্রতিদিন শত শত রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা এই সেতুর ওপর দিয়ে আসা যাওয়া করেন। যানজটে মাঝেমধ্যে অ্যাম্বুলেন্সে মুমূর্ষু রোগীদের আটকে থাকতে হয়। নতুন সেতুটি ব্যবহার করা গেলে জনসাধারণ ও রোগীদের এই ভোগান্তি এড়ানো যাবে।

জমির মালিকের যে দাবি, তা অন্যায় ও বেআইনি। সেতুর জন্য যতটুকু জায়গা প্রয়োজন, তা অধিগ্রহণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। জমির মালিকের দাবি মানলে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হবে।
মোহাম্মদ আলী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), মানিকগঞ্জ

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, নতুন সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা পরিষদের সদস্য মাইনুল ইসলামের ২৪ দশমিক ৫ শতক জমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগের জমি অধিগ্রহণ শাখাকে লিখিতভাবে জানায় এলজিইডি। পরে ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ অধিগ্রহণ শাখা থেকে ওই জমির অধিগ্রহণে নোটিশ দেয়। অধিগ্রহণের প্রায় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অধিগ্রহণ করা ওই জমি ঘেঁষে মাইনুল ইসলামের ছয়তলাবিশিষ্ট ভবন রয়েছে। মাইনুলের ছয়তলা ভবনের সামনে জেনারেটরের একতলা ভবন অপসারণের জন্য নোটিশ দেয় এলজিইডি। পরে একতলার জেনারেটরের কক্ষটি অপসারণ করা হয় এবং সেখানে সেতু নির্মাণ করা হয়। কিন্তু জমির মালিক মাইনুল ছয়তলা ভবনসহ জমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। তবে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরে গত বছরের ২৮ অক্টোবর ছয়তলা ভবনসহ অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তিতে উচ্চ আদালতের বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের বেঞ্চে রিট পিটিশন করেন মাইনুল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকদ্বয় এ বিষয়ে ৬০ দিনের মধ্যে সুরাহা করতে জেলা প্রশাসককে আদেশ দেন। এর পরপরই মাইনুল সেতুর দক্ষিণ পাশে ছয়তলা ভবন ঘেঁষে সেতুর সংযোগ সড়কে টিনের বেড়া দিয়ে আটকে দেন। পরে সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

এ ব্যাপারে মাইনুল বলেন, তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ছয়তলা ভবন ঘেঁষে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ওই ভবনে প্রবেশ করতেও সমস্যা হচ্ছে। সেতু ও সংযোগ সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল করলে ভবনটি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এতে পুরো ছয়তলা ভবনসহ অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের জন্য উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেছেন এবং সংযোগ সড়কের জায়গা আটকে রেখেছেন। যতটুকু অধিগ্রহণ করা হচ্ছে, সেই জমির মূল্যও তিনি পাননি।

জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণ শাখা সূত্রে জানা যায়, জমির মালিকের ছয়তলা ভবনের সামনের জায়গা অধিগ্রহণ ও সেখানে একতলা ছোট ভবনের (জেনারেটরের কক্ষ) ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

গত শনিবার দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে, পুরোনো সেতুটি দিয়ে তিন চাকার বিভিন্ন যাত্রীবাহী ছোট যান, প্রাইভেট কার, পিকআপ ভ্যান, বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেল চলাচল করছে। একটি প্রাইভেট কার সেতুতে উঠলে অন্য পাশে যানবাহনগুলোকে দীর্ঘ সারিতে আটকে থাকতে হচ্ছে।

স্থানীয় জয়রা গ্রামের সুজন হোসেন, সেলিম হোসেন, পান্নু মিয়াসহ ক্ষুব্ধ আরও কয়েকজন এলাকাবাসী বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে শত শত যানবাহন ও হাজার হাজার মানুষ চলাচল করেন। পুরোনো অপ্রশস্ত সেতুর কারণে দুই পাশে দীর্ঘ যানজটে সবাই ভোগান্তিতে রয়েছেন। নতুন সেতুর কাজ শেষ। কিন্তু অধিগ্রহণ করা জমির মালিক বেআইনি ও অন্যায়ভাবে সংযোগ সড়ক নির্মাণের জায়গা আটকে রেখেছেন।

এলজিইডি সদর উপজেলা কার্যালয়ের তথ্যমতে, সেতুটির কাজ সম্পন্ন হলেও সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়নি। ৬০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭ দশমিক ৩ মিটার প্রস্থের সেতুটির নির্মাণ প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এলজিইডির অধীন মেসার্স এস হোসাইন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতু নির্মাণের কাজ করছে।

সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. কামরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয় সুরাহা করতে জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করা হবে।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেন, জমির মালিকের যে দাবি, তা অন্যায় ও বেআইনি। সেতুর জন্য যতটুকু জায়গা প্রয়োজন, তা অধিগ্রহণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। জমির মালিকের দাবি মানলে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হবে। সংযোগ সড়কে প্রতিবন্ধকতা উচ্ছেদ এবং নির্মাণকাজ চলমান রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।