চায়ের দোকানে বাবা আবদুল আজিজের পাশে মো. ইমন আলী। শনিবার দুপুরে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ধোপাপাড়া বাজারে
চায়ের দোকানে বাবা আবদুল আজিজের পাশে মো. ইমন আলী। শনিবার দুপুরে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ধোপাপাড়া বাজারে

বাবার চায়ের দোকান, ছেলের মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ—আনন্দের পাশে অনিশ্চয়তা

ফজরের নামাজের পর চায়ের কেটলি বসে। ধোপাপাড়া বাজারের ছোট্ট দোকানে বাবা আবদুল আজিজ চা বানান আর ছেলে মো. ইমন আলী (২০) কখনো কাপ বাড়িয়ে দেন ক্রেতার হাতে, কখনো সামলান ক্যাশ বাক্স। পড়ালেখার ফাঁকে এভাবে সুযোগ পেলেই বাবার পাশে এসে দাঁড়ান তিনি। ইমন এবার মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। আনন্দ আছে, আছে অনিশ্চয়তাও। মেডিকেলের খরচ কীভাবে আসবে?

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ধোপাপাড়া মোহনপুর এলাকার বাসিন্দা মো. ইমন আলী ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধাক্রমে ৬৮৬তম হয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। বাবা আবদুল আজিজ স্থানীয় বাজারে একটি ছোট চায়ের দোকান চালান। সেই দোকানই তাঁদের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। কোনো জমিজমা নেই, শুধু আছে বাড়িভিটে।

চায়ের দোকানেই বড় হওয়া ইমনের শৈশব কেটেছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। কখনো বাবার পাশে দাঁড়িয়ে চা ঢেলেছেন, আবার পড়ার টেবিলে বসে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। ধোপাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ধোপাপাড়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ থেকে। কলেজে ভর্তি, কোচিং, মেসভাড়াসহ সব খরচই এসেছে বাবার চায়ের দোকান থেকে আর ধারদেনার টাকায়।

ইমন বলেন, ‘ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি করানোর সময় আব্বা ঋণ করেছিলেন। অনেক সময় ঠিকমতো খাওয়া জোটেনি। কলা আর রুটি খেয়েও দিন গেছে। তবু আব্বা কখনো হাল ছাড়েননি। আমিও হাল ছাড়িনি। গ্রামে পড়ার সময় আব্বার কাজে সাহায্য করেছি। যখন রাজশাহী শহরে পড়তে যাই, বাড়িতে এলে বাবার চায়ের দোকানেই কাজ করেছি। আমি একজন মানবিক চিকিৎসক হতে চাই। গরিব মানুষের চিকিৎসা করতে চাই। সবাই যেন আমার জন্য দোয়া করে, এটুকুই চাওয়া।’

ভর্তি, আবাসন, থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার খরচ মিলিয়ে যে বিপুল অর্থ দরকার, তা জোগাড় করা এই পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ইমনকে ১২ জানুয়ারি ভর্তি হতে হবে। সেখানে খরচ পড়বে ১২ হাজার টাকার মতো।

চায়ের দোকানে বসে কথা হয় ইমনের বাবা আবদুল আজিজের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত আল্লাহ যতটুকু সাহায্য করছেন, ততটুকু দিয়েই ছেলেটাকে পড়াইছি। ব্যাংক থেকে ঋণ করছি, কিস্তি তুলছি, দোকানে বাকিও আছে। এখন মেডিকেলে পড়তে অনেক টাকা লাগবে। আমি চেষ্টা করতেছি, আল্লাহর ওপর ভরসা।’ ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবদুল আজিজের কণ্ঠে গর্বের সঙ্গে শঙ্কাও স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমি কারও কাছে হাত পাততে যাইনি। যতটুকু সাধ্য ছিল, করছি। এখন শুধু চাই, আমার ছেলে ভালো ডাক্তার হোক, গরিব মানুষের সেবা করুক।’

ইমনের মা বিউটি বেগম বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ছেলেকে বড় করেছি। এখন এত টাকা কোথা থেকে আসবে, বুঝতে পারছি না। আল্লাহই ভরসা।’

ইমনের সাফল্যে খুশি স্থানীয় লোকজন। তাঁরা বলছেন, এত কষ্ট করে পড়াশোনা করা একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন টাকার অভাবে থেমে না যায়।

প্রতিবেশী মোহাম্মদ আক্তার হোসেন বলেন, ইমন ছোটবেলা থেকেই খুব পরিশ্রমী। তার বাবাও অনেক কষ্ট করে ছেলেটাকে এ পর্যন্ত এনেছেন। আর্থিক সহায়তায় সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের এগিয়ে আসা উচিত।

স্থানীয় কলেজশিক্ষক মনজুরুল হক বলেন, ‘ইমন ভদ্র, মেধাবী ও দায়িত্বশীল। বাবার সঙ্গে সে নিজেও কাজ করে। সে একজন ভালো চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করবে, এই বিশ্বাস আমাদের আছে।’