ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় নির্বাচনী বিরোধের জেরে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় নির্বাচনী বিরোধের জেরে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নে

নাসিরনগরে নির্বাচনী বিরোধে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুজন নিহত, আহত অর্ধশতাধিক

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় নির্বাচনী বিরোধের জেরে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন। আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

নিহত দুজন হলেন গোয়ালনগর ইউনিয়নের হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিবুল্লাহ (৪০) ও আক্তার মিয়া (৫০)। হাবিবুর গোয়ালনগর ইউনিয়নের সিমেরকান্দি জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন এবং স্থানীয় হান্নান মিয়ার ছেলে। অন্যদিকে আক্তার গোয়ালনগর গ্রামের হাছন আলীর ছেলে। তিনি চট্টগ্রামে শ্রমিকের কাজ করতেন। আক্তার মিয়া স্থানীয় রহিম তালুকদারের পক্ষের এবং হাবিবুর কাশেম মিয়ার পক্ষের লোক ছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের বিএনপির প্রার্থী ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নানের পক্ষে গোয়ালনগর ইউনিয়নে কাজ করেন বিএনপির সমর্থক রহিম তালুকদারের লোকজন। অন্যদিকে একই ইউনিয়নে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সহসভাপতি কে এম কামরুজ্জামানের পক্ষে কাজ করেন স্থানীয় কাশেম মিয়ার লোকজন। রহিম ও কাশেমের মধ্যে নির্বাচনের আগে থেকেই বিরোধ ছিল। ভোটের দিন সকালে গোয়ালনগর উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়ার প্ররোচনার অভিযোগে রহিম তালুকদার পক্ষের সমর্থক জিয়া মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে সেনাবাহিনী। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে ১০ দিনের কারাদণ্ডাদেশ দেন। ১৪ মার্চ কারামুক্ত হয়ে এলাকায় ফেরেন জিয়া।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারামুক্ত জিয়ার সন্দেহ ছিল, কাশেম মিয়ার পক্ষের শিশু মিয়া সেনাবাহিনীকে তথ্য দিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সহযোগিতা করেছেন। ওই সন্দেহ থেকে ১৬ মার্চ বিকেলে শিশু মিয়াকে মারধর করার পাশাপাশি তাঁর মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এরপর ১৭ মার্চ সকাল থেকে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ওই দিন বিকেলে উভয় পক্ষের মধ্যে পাঁচ ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ৩০ জন আহত হন।

ওই ঘটনার জেরে গতকাল সোমবার রাত থেকে আবার সংঘর্ষের প্রস্তুতি শুরু করে উভয় পক্ষ। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলাসহ নাসিরনগরের বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে উভয় পক্ষ ভাড়া করে বহিরাগত লোকজন এলাকায় আনে। পাশাপাশি রহিম তালুকদারের পক্ষে গোয়ালনগর ইউনিয়নের গোয়ালনগর, মাছমা ও রামপুর গ্রামের লোকজন জড়ো হন এবং কাশেম মিয়ার পক্ষে গোয়ালনগর গ্রামের একাংশ, স্কুলপাড়া, লালুয়ারটুকু, কদমতলী, দক্ষিণদিয়া, শিবপুরসহ সাত গ্রামের লোকজন জড়ো হন। আজ সকাল ৯টার দিকে উভয় পক্ষের লোকজন টেঁটা, বল্লম, এককাইট্টা, ছুরি, চায়নিজ কুড়াল, লাঠিসোঁটা ও দেশি অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

সংঘর্ষে দুই পক্ষের দুজন নিহত হন। আহত হন অর্ধশতাধিক। তাঁরা নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। খবর পেয়ে নাসিরনগর থানা ও চাতলপাড় পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান।

নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সংঘর্ষে দুজনের মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। তবে তাঁদের কারও লাশ হাসপাতালে আনা হয়নি। বেলা দেড়টা পর্যন্ত আহত দুজন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য একজনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ও অন্যজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

বেলা পৌনে দুইটার দিকে গোয়ালনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আজহারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, আজকের সংঘর্ষে রহিম তালুকদারের পক্ষের আক্তার মিয়া ও কাশেম মিয়ার পক্ষের হাবিবুর রহমান নিহত হয়েছেন। অর্ধশতাধিকের বেশি আহত হয়েছেন, এখনো সংঘর্ষ চলছে। রহিমের পক্ষের লোকজন বাইরে থেকে তিন থেকে চার শ লোক ভাড়া করে এনেছে।

এ বিষয়ে জানতে রহিম তালুকদার ও কাশেম মিয়ার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও কেউ সাড়া দেননি। বিএনপি-দলীয় সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের মুঠোফোনে কল করলেও তিনি ধরেননি। অন্যদিকে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী কে এম কামরুজ্জামানের মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পূর্ববিরোধে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিক ছোটখাটো ভুল-বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই পক্ষ দুই দিকে অবস্থান নিয়েছিল। নির্বাচনী সহিংসতায় নয়, পুরোনো ও পূর্ববিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় পুলিশ পাঠানো হয়েছে। দুই পক্ষের দুজন নিহত হয়েছেন।

প্রসঙ্গত, ঈদের দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড়ের দুই জায়গায়, বুড়িশ্বর ইউনিয়নের উত্তরপাড়ায় তরুণীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ও বুড়িশ্বর গ্রামের দাওয়াত দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে মারধর, ভলাকুট ইউনিয়নের বালিখোলা গ্রামসহ ছয় স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। চাতলপাড়ে টর্চের আলো চোখে পড়ায নিয়ে দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষের হামলায় মোসাব্বির হোসেন বাবলু (১৭) নামে এক কিশোর নিহত হয়।