রাজশাহীতে বিএনপির কর্মসূচি

বাধার কারণে প্রচার বেশি, চাঙা নেতা-কর্মীরাও 

নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও রাজশাহীতে বড় জমায়েত করতে পেরেছে বিএনপি। দলটির স্থানীয় নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন পর বড় আকারের এই কর্মসূচির মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া গেছে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা চাঙা হয়েছেন। দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ আপাতদৃষ্টিতে কমে এসেছে। সরকারের তরফ থেকে নানাভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টায় সাধারণ মানুষের সহানুভূতিও গেছে বিএনপির ঘরে। গণমাধ্যমের প্রচারও বেশি পেয়েছে। 

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, বিএনপির সমাবেশ সফল হয়নি। তবে দলটির নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, বাধার মুখেও রাজশাহীতে বিএনপি যেভাবে জমায়েত করেছে, তা গত ১৪ বছরে প্রথম ঘটনা। অবশ্য সরকার কঠোর অবস্থানে থাকলে এমনটা হওয়ার সুযোগ ছিল না।

দলের জন্য ভালোবাসা না থাকলে কাজকর্ম ফেলে চার দিন থেকে মানুষ খোলা আকাশের নিচে এই শীতের মধ্যে থাকতেন না। 
রুহুল কুদ্দুস তালুকদার, বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক

ধারাবাহিক বিভাগীয় গণসমাবেশের অংশ হিসেবে গত শনিবার রাজশাহীতে সমাবেশ করে বিএনপি। এতে মূলত রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলার নেতা-কর্মীরা যোগ দেন। এই সমাবেশ সামনে রেখে গত ১৫ নভেম্বর থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীদের নামে মামলা শুরু হয়। সমাবেশের আগের দিন পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগে ৬১টি মামলায় ১১৫ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজশাহী বিভাগীয় সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি আট জেলায় ১ ডিসেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিহন ধর্মঘট ডাকে। এতে তৈরি হয় জনদুর্ভোগ। বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ ধর্মঘট শুরু হওয়ার আগে বুধবার রাতে রাজশাহী চলে আসে। ঈদগা মাঠে তাঁবু করে তাঁরা তিন-চার দিন সেখানে অবস্থান করেন। 

কর্মীদের এই মনোবলকে শক্তি হিসেবে দেখছে বিএনপি। এর মধ্য দিয়ে কর্মীদের ঐক্য আরও সংহত হয়েছে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে প্রতিটি থানা, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও মহানগরের ওয়ার্ড পর্যায়ে বিভেদ ভুলে একসঙ্গে প্রস্তুতিসভা করেছেন নেতা-কর্মীরা। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে এক বছর ধরে নুতন ও পুরোনো নেতাদের মধ্যে চলা টানাপোড়েনও দৃশ্যত কমেছে। যদিও সভামঞ্চে কিছুটা বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে। তবে গত দুটি জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার যেভাবে কঠোর অবস্থানে ছিল, সামনে আবার সে অবস্থানে গেলে নেতা-কর্মীদের কতটুকু মাঠে পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। 

সমাবেশের সমন্বয়কারী ও বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, দলের জন্য ভালোবাসা না থাকলে কাজকর্ম ফেলে চার দিন থেকে মানুষ খোলা আকাশের নিচে এই শীতের মধ্যে থাকতেন না। পথে পথে বাধা পেয়েছেন, মোটরসাইকেলের ওপর আক্রমণ হয়েছে। মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় না করে গ্রামের যে মানুষগুলো হেঁটে তিন দিন আগে সমাবেশে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ঐক্য আরও সুদৃঢ় হয়েছে। তাঁরা চাঙা হয়েছেন। ভেদাভেদ ভুলে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। ধর্মঘটের কারণে সাধারণ মানুষও দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। বিএনপিই তাঁদের সমবেদনা পেয়েছে। দিন শেষে সরকার গণবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। 

তবে বিএনপির সমাবেশ পুরোপুরি সফল হয়েছে, এমনটা প্রকাশ্যে বলছেন না আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা। তাঁরা মনে করছেন, তাঁদের দল ও সরকার বিএনপিকে সুযোগ দিয়েছে। যে কারণে বিএনপি জমায়েত করতে পেরেছে। গত শনিবার বিএনপির সমাবেশ চলাকলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন এক প্রতিবাদ সভায় বিএনপির সমাবেশকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলে দাবি করেন। 

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ডাবলু সরকার প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি ঘোষণা দিয়েছিল ১৪ লাখ মানুষের সমাগম ঘটাবে। উত্তরে শহরের আমচত্বর, পশ্চিমে কাশিয়াডাঙ্গা ও পূর্বে তালাইমারী পর্যন্ত তাদের জমায়েত ছড়িয়ে পড়বে। বাস্তবে দেখা গেছে, মাঠেই লোক ছিল না। যারা ছিল, তারা নিজেরা নিজেরা মারামারি করেছে। 

সমাবেশের আগে কৌশলে পরিবহন ধর্মঘট দেওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে দুই ধরনের মত আছে। অনেকে মনে করছেন, এর মধ্য দিয়ে বিএনপিকে কিছুটা চাপ ও ভয়ে রাখা হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এর ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগে সরকারি দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ধর্মঘট না থাকলে বিএনপির কর্মীরা শুধু সমাবেশের দিন শহরে এসে চলে যেতেন। কিন্তু তাঁরা তিন ঘণ্টার বদলে তিন দিন ধরে ছিলেন। এর প্রচার বেশি হয়েছে।