
কোরবানির অনেক পশু উঠেছে হাটে। হাটের যেটুকু গবাদিপশুর জন্য বরাদ্দ—তার পুরোটাই ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের গরুতে পূর্ণ হয়ে আছে। এর মধ্যে ভিড় ঠেলে আরও এক-দুইটা করে গরু ঢুকছে হাটে। হাটে ক্রেতা-দর্শকেরও কমতি নেই। গায়ে গা ঘেঁষে হাঁটতে হচ্ছে, দাঁড়াতে হচ্ছে। তবু হাটে পশু নিয়ে আসা খামারিদের মন ভালো নেই। কাঙ্ক্ষিত ক্রেতার দেখা পাননি তাঁরা। ক্রেতারা গরু দেখছেন, কেউ দরদামও করছেন। তারপর মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছেন।
গতকাল রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার প্রাচীন বেচাকেনার মোকাম টেংরা বাজারে কোরবানির পশুর বেচাবিক্রির পরিস্থিতি ছিল এ রকম। এ হাটটি পশু ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য বিখ্যাত। ঈদের আগে হাতে আছে আর দুই দিন সময়। এর মধ্যে বিক্রি বাড়তে পারে—এটুকু আশাতেই আছেন খামারিরা।
কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য ১৫টি গরু নিয়ে এসেছেন রূপিয়ান মিয়া। তাঁর বাড়ি টেংরা বাজারের কাছে। অনেক বছর ধরে তিনি এই হাটে গরু কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, ‘বাজারের অবস্থা অখন অইলে হাইল অইবো, নাইলে মাইল অইবো (হয় চড়া হবে, না হয় মন্দা হবে)। দর মাইনসের বাটে পড়ের না (দাম মানুষের নাগালের মধ্যে হচ্ছে না)।’
রূপিয়ান মিয়া জানান, অন্যান্য বছর ঈদের বাজার অনেক ভালো হয়। এবার বাজার সুবিধার নয়। বাজারে ক্রেতা কম। তারপরও যাঁরা আসছেন, তাঁরা দরদাম করে চলে যাচ্ছেন। তাঁর মতো খামারিদের কাছে যে গরু আছে। তা ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দামের। ঈদ সামনে রেখে গ্রামের বিভিন্ন ছোট ছোট হাট থেকে তাঁরা এই গরুগুলো সংগ্রহ করেছেন। তাঁর মতে, ‘মানুষ অভাবে মনে অর (হচ্ছে)। মানুষর আত (হাতে) টাকা নাই। ছোট গরু বেশি চায়। ৮০-৮৫ হাজার থেকে ১ লাখের মধ্যে গরু খোঁজে। অন্য বছর এমন দিনে গরুর বাজার চড়া যায়, এবার মন্দা যার (যাচ্ছে)।’
একই সারিতে খুঁটিতে বেঁধে রাখা অনেক গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা টেংরার রিয়াজুল মিয়া বলেন, ‘বেলা ১১টার দিকে গরু লইয়া আইছি। এখন বিকাল। দরদাম অর (করে), কিন্তু একটা গরুও বিক্রি অইছে না।’
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, গতকাল টেংরা বাজারের সাপ্তাহিক হাটবার। এটি একটি বড় বাজার। সব সময়ই সাপ্তাহিক হাটবার জমজমাট হয়। গরু-ছাগলসহ নানা রকম গেরস্থালি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে হাট সয়লাব থাকে।
গতকাল ছিল ঈদের বাজার। ওই দিন হাটে গিয়ে দেখা গেছে, মানুষের উপচে পড়া ভিড়। মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়ক থেকে হাটে ঢোকার রাস্তায় রীতিমতো ধাক্কাধাক্কি করে ঢুকতে হয়েছে। একসঙ্গে দুই দিক থেকে অনেক মানুষ ছুটে চলছেন। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, নানা রকম পণ্য ও গরু নিয়ে আসা পিকআপ ভ্যানসহ ছোট গাড়ি ঢুকে রাস্তায় জট তৈরি করছে। এর মধ্যে কেউ কোরবানির পশু নিয়ে হাটে ঢুকছেন, কেউ গরু-ছাগল কিনে হাট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। হাটে পশুর জন্য নিয়মিত বরাদ্দ স্থানটিতে গিয়ে দেখা যায়, ওই দিকে চলার অবস্থা নেই। দুপুরে বৃষ্টি হয়েছে। চারপাশে কাদা। কোথাও পানি জমে আছে। হাটের ভেতরে হাঁটাপথে দুই পাশে বাঁশের খুঁটিতে ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের গরু বেঁধে রাখা হয়েছে। তবে মানুষের উপস্থিতি, দরদাম ও হইচইয়ের তুলনায় তখনো বেচাবিক্রি কম। বিক্রেতাদের মন খারাপ। অনেকেই কোরবানির হাট সামনে রেখে লাভের আশায় পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। এখন বিক্রি না হলে লাভ তো দূরে থাক, পুঁজিটাই আটকে যাবে।
এত গরুর ভিড়ে চকচকে কালো রঙের একটি ষাঁড়ের গলায় কাগজের রঙিন ফুলের মালা পরানো আছে। ষাঁড়ের চামড়ার তেলতেলে ভাব ও ফুলের মালায় ভিড়ের মধ্যে ষাঁড়টিকে অন্য গরুর থেকে আলাদা করে চোখে পড়ে। ষাঁড়টির মালিক রাজনগর সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ দাসপাড়া গ্রামের রিপন মিয়া বলেন, ‘এটা আমার নিজর পালা ষাঁড়। খুব যত্ন করে পালছি। দাম বেশিই চাইরাম, তবে আড়াই লাখ টাকার উপরে পাইলে বেচমু।’ ষাঁড়টির কাছে দাঁড়ানো অবস্থায় বেশ কজন ক্রেতা ভিড় করেন। দাম শোনেন, চুপি চুপি কথা বলেন। তারপর অন্যদিকে চলে যান।
বাজারের পূর্বদিকে অন্য সময় যেখানে মাছসহ অন্যান্য পণ্য বিক্রি হয়, সেই স্থানটিও কোরবানির পশুর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ছোট আকারের দুটি গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উজিরপুরের রাছিত মিয়া বলেন, ‘বিক্রি অর (হচ্ছে) না। দরদাম করে, এরপর আর দাঁড়ায় না। আমার পালা দুইটা গরু লইয়া আইছি। হকলেই বেচার লাগি আইছি। আশা কররাম, সন্ধ্যার পর বিক্রি অইবো।’
কোরবানির হাটে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পণ্যের পসরাও অনেক। দা, ছুরি নিয়ে বসেছেন অনেকে। তবে মাংস কাটার এসব অস্ত্র বিক্রিতেও মন্দা চলছে। বিক্রেতা নৃপেশ চন্দ্র দেব বলেন, ‘বিক্রি নাই, কাস্টমার নাই।’
হাটের বাইরে মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কের পাশে পশুর খাদ্য ঘাস, আধা পাকা ধানগাছের সবুজ আঁটি নিয়ে বসেছেন শুকুর মিয়া। তিনি জানালেন, যে ঘাস নিয়ে বসেছেন, অন্য হাটের দিন হলে বিকেলের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যেত। তাঁর মতে, ‘মানুষের মধ্যে অভাব বেশি। অন্য বছর যে দুইটা গরু কোরবানি দিত, হে (সে) এবার একটা দের (দিচ্ছে)।’ সড়কের পাশে নানা জাতের মসলা নিয়ে বসেছেন খুচরা বিক্রেতারা। তাঁদের বিক্রিও তখনো (সন্ধ্যার পর) তেমন জমজমাট ছিল না।
গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রি ভালো না হলেও খামারিদের মধ্যে তখনো আশা জেগে আছে। দুই দিন সময় আছে। এখন আর হাটবার বলে কিছু নেই। ঈদের রাত পর্যন্ত টেংরা বাজার টানা চলবে।